Cvoice24.com

চট্টগ্রামে প্রতিমা তৈরির ধুম, ঘুমহীন কারিগররা

শুভ্রজিৎ বড়ুয়া, সিভয়েস২৪
২২:৫৬, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চট্টগ্রামে প্রতিমা তৈরির ধুম, ঘুমহীন কারিগররা

এক হাতে কাদামাটি, অন্য হাতে কাঠি। সামনে অর্ধসমাপ্ত দেবীর মুখ। কপাল, নাক, চোখ— সবই যেন ধীরে ধীরে মাটির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। পাশে খড়ের স্তূপ, বাঁশের কাঠামো আর রঙের কৌটা। ঘড়ির কাঁটা রাত পেরোলেও কাজ থামে না। দুর্গাপূজার আগে প্রতিটি ঘণ্টাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রতিমালয়ে এমন দৃশ্যই চোখে পড়ছে। সদরঘাট, দেওয়ানজী পুকুরপাড়, এনায়েতবাজার-গোয়ালপাড়া, চট্টেশ্বরী রোড, হাজারী লেন, পাথরঘাটা, নালাপাড়াসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যস্ত প্রতিমাশিল্পীরা। নগরের বাইরে চন্দনাইশ, ফটিকছড়ি, বাঁশখালীসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলাতেও চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।

উৎসবের দিনক্ষণ যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে তাদের ব্যস্ততা। কারও কাজ মাটির শেষ প্রলেপে, কারও রংয়ে, কেউ আবার ব্যস্ত দেবীর অলংকার ও পোশাক তৈরিতে।

মাটির প্রথম স্পর্শ থেকে চোখ আঁকা পর্যন্ত

একটি প্রতিমার জন্ম হয় খুব সাধারণ কিছু উপকরণে— বাঁশ, খড় ও মাটি। প্রথমে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে কাঠামো। তার ওপর খড় দিয়ে শরীরের আকৃতি। এরপর কয়েক ধাপে মাটির প্রলেপ। মাটি শুকিয়ে গেলে মসৃণ করা হয়। তারপর রং।

সবচেয়ে সূক্ষ্ম কাজগুলোর একটি দেবীর মুখ তৈরি। চোখের রেখা, ঠোঁটের বাঁক, নাকের গড়ন— সামান্য ভুলেই বদলে যেতে পারে পুরো মুখের অভিব্যক্তি। তারপর আসে শাড়ি, চুল, অলংকার ও অন্যান্য সাজ। একটি প্রতিমার পেছনে তাই শুধু একজন কারিগর থাকেন না। প্রয়োজন হয় কয়েকজনের সমন্বিত শ্রমের।

৪৭ বছর ধরে মাটির সঙ্গে

ফটিকছড়ির প্রতিমাশিল্পী বাবুল পাল এই পেশায় আছেন ৪৭ বছর। একসময় বাবার হাত ধরে মাটি নিয়ে বসেছিলেন। এখন পাশে কাজ করছেন ছেলে প্রণয় পাল ও ভাগিনা প্রকাশ দে। চলতি মৌসুমে তার হাতে এসেছে ১২টি প্রতিমার অর্ডার।

বাবুল পাল বলেন, ‘মাঝারি আকারের একটি প্রতিমা তৈরি করতে তিন থেকে চার দিন লাগে। বড় প্রতিমার ক্ষেত্রে সময় লাগে ১০ থেকে ১২ দিন। সবচেয়ে বড় প্রতিমাটির দাম এবার ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা।’

কথার ফাঁকে তার চোখ চলে যায় আধা তৈরি একটি প্রতিমার দিকে। কাজ বাকি, অথচ সময় কম।

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু প্রতিমা বানালেই তো শেষ নয়। মাটি শুকাতে হবে, এরপর রং, পোশাক, অলংকার। কোথাও একটু দেরি হলে পুরো কাজের সময়সূচি পিছিয়ে যায়।’

ছেলের হাতে বাবার শিল্প

প্রতিমা তৈরির কর্মশালাগুলোতে এখন নতুন প্রজন্মকেও দেখা যাচ্ছে। বাবুল পালের সঙ্গে যেমন কাজ করছেন তার ছেলে প্রণয় পাল।

এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে আছে এই শিল্প। কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নয়, কর্মশালার মেঝেতেই শেখা হয় মাটি ধরার কৌশল, খড় বাঁধার নিয়ম, মুখের অনুপাত কিংবা রংয়ের ব্যবহার।

একজন অভিজ্ঞ কারিগর পাশে থাকেন, আরেকজন শিখতে শিখতে হাতে তুলে নেন নিজের কাজ।

সামনে সময়ের পরীক্ষা

এবারের দুর্গাপূজার মহালয়া ১০ অক্টোবর। ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী দিয়ে মূল উৎসব শুরু হয়ে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে শেষ হবে। অর্থাৎ প্রতিমাশিল্পীদের হাতে সময় খুব বেশি নেই।

মণ্ডপে প্রতিমা পৌঁছানোর আগে শেষ করতে হবে মাটি, রং, পোশাক ও অলংকারের কাজ। এরপর নিরাপদে সেটি নিয়ে যেতে হবে নির্দিষ্ট মণ্ডপে।

এই কয়েক সপ্তাহের চাপের মধ্যেই তাদের দিন কাটছে।

কেউ উপকরণের দাম নিয়ে চিন্তিত, কেউ সময় নিয়ে। কারও হাতে অর্ডার বেশি, কারও হাতে কম। কিন্তু সবার লক্ষ্য এক। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমাটিকে পূর্ণ রূপ দেওয়া।

উৎসবের আলোর নেপথ্যে তারা

কয়েক সপ্তাহ পর চট্টগ্রামের মণ্ডপগুলো আলোয় ভরে উঠবে। ঢাকের শব্দে মুখর হবে চারপাশ। দর্শনার্থীদের ভিড়ে দেবীর সামনে দাঁড়াবে মানুষ। তখন হয়তো খুব কম মানুষই মনে রাখবেন সেই কারিগরের কথা, যিনি দিনের পর দিন মাটিতে হাত ডুবিয়ে দেবীর মুখটি গড়ে তুলেছিলেন।

কেউ জানবেন না, কোন রাতে তার কাজ শেষ হয়েছে। কিংবা কতবার মাটি শুকানোর অপেক্ষায় বসে থাকতে হয়েছে। কতটা খরচ বেড়েছে, কতটা লাভ থাকবে, সেসব হিসাবও উৎসবের আলোয় হারিয়ে যাবে।

কিন্তু প্রতিমার চোখে যে দৃষ্টি, মুখে যে অভিব্যক্তি, শরীরে যে নিখুঁত গড়ন। তার প্রতিটি রেখায় থেকে যাবে তাদের হাতের ছাপ। চট্টগ্রামের প্রতিমালয়গুলোতে এখন সেই হাতই ব্যস্ত। বাইরে উৎসব আসার অপেক্ষা। আর ভেতরে মাটির শরীরে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছেন দেবী। মহালয়ার আগেই হয়তো তার চোখ আঁকা শেষ হবে। তারপর তিনি চলে যাবেন মণ্ডপে। কারিগরেরা ফিরে যাবেন আরেকটি অর্ডারের কাজে—উৎসবের আলো থেকে একটু দূরে, মাটির কাছে।

মণ্ডপে মণ্ডপে আলাদা ভাবনা

এ তথ্য জানিয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নিখিল কুমার নাথ বলেন, ‘নগরের এবার দুর্গাপূজা হবে ২৯৪টি মণ্ডপে। যা গতবারের তুলনায় ২টি বেশি। প্রতিটি পূজা মণ্ডপ সাজবে ভিন্ন ভিন্ন সাজের ভিন্ন ভিন্ন সজ্জায়।’

নগরের উত্তর কাট্টলী কালীবাড়ির সার্বজনীন পূজামণ্ডপের রূপ দিচ্ছেন তন্ময় দাশ। মণ্ডপটির এবারের ভাবনা—‘অবিনশ্বর’। এতে ফুটিয়ে তোলা হবে—জীবন-মৃত্যু বা সৃষ্টি-বিনাশের চক্র উপলব্ধি করার সাধনা।

পূজা মণ্ডপটির তত্ত্বাবধানে থাকা ঋত্বিক দাশ বলেন, ‘আমরা সবসময় বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, পুরাণ ও সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করি। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। অনেক পূজামণ্ডপ ভিন্ন ভিন্ন থিমে বা সাজে উদযাপনকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।’

অন্যদিকে দক্ষিণ নালাপাড়ায় পূজা-মণ্ডপ সাজছে ‘পাড়া-মহল্লা’ থিমে। এতে উপস্থাপন করা হবে—পাড়া-মহল্লার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতি।

সুজয় নামে এক মৃৎশিল্পী বলেন, ‘এখন প্রতিমাশিল্পীর কাজ শুধু একটি প্রতিমা তৈরি করে দেওয়া নয়। মণ্ডপের ভাবনা, নকশা ও পরিবেশের সঙ্গে মিল রেখেও তৈরি করতে হচ্ছে দেবীর অবয়ব।’

নিরাপত্তা নিশ্চিতে তৎপরতা প্রত্যাশী

উদযাপনের নিরাপত্তা চেয়ে অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার নাথ বলেন, ‘আমরা এ উদযাপন যেন স্বতঃস্ফূর্ত করতে প্রশাসনের সহযোগিতা ও আন্তরিকতা আশা করছি। মণ্ডপের নিরাপত্তায় পুলিশ আমাদের যথেষ্ট সহযোগিতা করছেন। কিন্তু চুরি ও ছিনতাই রোধে পুলিশ আরও তৎপর হলে মানুষ মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পাবে।’