চবির ৫০৩ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন
চবি প্রতিনিধি, সিভয়েস২৪
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ৩৬তম বার্ষিক সিনেট সভায় ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৫০৩ কোটি ৪৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকার মূল বাজেট অনুমোদন করা হয়েছে। একই সভায় ২০২৫–২৬ অর্থবছরের ৪৮৯ কোটি ৯৯ লাখ ৭৯ হাজার টাকার সংশোধিত বাজেটও অনুমোদন দেওয়া হয়।
শনিবার (৮ আগস্ট) বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. এ. আর. মল্লিক ভবনের উপাচার্য দপ্তরের সভাকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান।
সভায় উপাচার্য তার লিখিত বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন এবং ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহতদের স্মরণ করেন।
উপাচার্য বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পুনর্জাগরণ ঘটেছে। তিনি জুলাই আন্দোলনে নিহত আবু সাঈদ, ওয়াসিম আকরাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তরুয়া ও ফরহাদ হোসেনকে স্মরণ করেন। এ ছাড়া শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকেও স্মরণ করেন তিনি।
গবেষণায় ১০ কোটি টাকা
উপাচার্য জানান, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে শিক্ষকদের গবেষণা অনুদান খাতে ১০ কোটি টাকা, এমফিলসহ অন্যান্য খাতে ৬৭ লাখ টাকা এবং পিএইচডি ও মাস্টার্স থিসিসে অর্থ অনুদান চলমান রয়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য ইউজিসির কাছে ২৯ কোটি টাকা গবেষণা অনুদান চেয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, গবেষণার মান উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের গুণগত মান নিশ্চিত করতে Institutional Quality Assurance Cell (IQAC) কাজ করছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত IQAC-এর উদ্যোগে ৩০টির বেশি প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজন করা হয়েছে।
২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে Outcome-Based Education (OBE) এবং অভিন্ন সেমিস্টার পদ্ধতি চালু করা হয়েছে বলেও জানান উপাচার্য।
৭২৭ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প
উন্নয়ন কার্যক্রমের বিষয়ে উপাচার্য জানান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে Teacher-Students Complex (TSC) প্রতিষ্ঠার জন্য ৪৯ কোটি ৩৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা এবং একাডেমিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ৬৭৮ কোটি ১৪ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ব্যয়ের দুটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (DPP) পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে TSC কমপ্লেক্স, ১০ তলা ছাত্রী হল, তিনটি একাডেমিক ভবন, তিনটি গবেষণা কমপ্লেক্স, সিনেট ভবন, দ্বিতীয় প্রশাসনিক অ্যানেক্স ভবন, সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, গ্রাউন্ড ওয়াটার রিজার্ভার, এসটিপি ও বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন নির্মাণের কথা রয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়তে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আরও দুটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানান উপাচার্য। এসব প্রকল্পের আওতায় ছাত্রদের জন্য পাঁচটি ও ছাত্রীদের জন্য পাঁচটি ১০ তলা আবাসিক হল, বিদেশি শিক্ষার্থী ও পিএইচডি-মফস্বল গবেষকদের জন্য একটি হল, চারটি ১০ তলা একাডেমিক ভবন, ব্লু-ইকোনমি রিসার্চ সেন্টার, কেন্দ্রীয় জাদুঘর, গ্রন্থাগারের দ্বিতীয় ভবন, স্টেডিয়াম ও সুইমিং পুল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া আধুনিক গবেষণাগার, ৫০ শয্যার হাসপাতাল, ডে-কেয়ার সেন্টার, বহুতল অফিস ভবন, টিচার্স ডরমেটরি, সৌরবিদ্যুৎসহ ওয়াকওয়ে, ফুড কোর্ট ও ওয়েট মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। পুরোনো ভবন ও স্থাপনা সংস্কারের জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আরও দুটি DPP প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
HEAT প্রকল্পে ২৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা
উপাচার্য বলেন, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ইউজিসির বাস্তবায়নাধীন Higher Education Acceleration and Transformation (HEAT) প্রকল্পের আওতায় প্রথম রাউন্ডে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ২৯ কোটি ৭৪ লাখ ৮১ হাজার টাকার আটটি সাব-প্রকল্প চলমান রয়েছে।
এসব প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষাদান ও শেখার পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি চিকিৎসা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী দক্ষতা উন্নয়নে কাজ হবে। দ্বিতীয় রাউন্ডে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৫২টি প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে, যা বর্তমানে যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।
ডিজিটাল সেবায় জোর
শিক্ষা ও সেবার আধুনিকায়নে Digital Network ও High Powered Wi-Fi চালু, Internet of Things (IoT) সেন্সরযুক্ত ড্যাশবোর্ড, নিরাপত্তা ক্যামেরা এবং রিয়েল টাইম তথ্য সরবরাহে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার চালুর প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান উপাচার্য। পরীক্ষা-সংক্রান্ত সব কার্যক্রম Automation-এর আওতায় আনা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
স্বাস্থ্যসেবার আধুনিকায়ন এবং ৫০ শয্যার মেডিকেল সেন্টার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
উপাচার্য বলেন, বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর ভিশন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) ২০৩০-এর চতুর্থ লক্ষ্য (SDG-4) সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থাকে আধুনিক করার চেষ্টা চলছে।
সভায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন ও উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. সফিকুল ইসলাম।
অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-আমীন বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়নে নেতৃত্বদানকারী অন্যতম প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গবেষণার পাশাপাশি কারিকুলামে বৈচিত্র্য আনা এবং শিক্ষার্থীদের দেশের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করে গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করছে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনোভেশন হাব প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শিষ্টাচার, নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলাবোধ, নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতে সহশিক্ষা কার্যক্রমের বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে খেলাধুলা, সংস্কৃতিচর্চা, বিতর্ক, চিত্রাঙ্কন, আলোকচিত্র ও চিত্রকলা প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন আয়োজন বছরজুড়ে চলছে।
উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, সৎ ও দক্ষ মানবসম্পদ সুশাসনের অন্যতম উপাদান। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্র ও IQAC-এর মাধ্যমে চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত রূপকল্প এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব, কর্তব্য ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে।
সভায় উপাচার্যের বক্তব্য ও বাজেটের ওপর আলোচনা করেন সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম (চট্টগ্রাম-১৩), এরশাদ উল্লাহ (চট্টগ্রাম-৮), গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী (চট্টগ্রাম-৬) ও সাঈদ আল নোমান (চট্টগ্রাম-১০)। উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান (চট্টগ্রাম-৯) ।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্যরা আলোচনায় অংশ নেন।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সভার কার্যক্রম শুরু হয়। পরে পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ থেকে পাঠ করা হয়। গত সিনেট সভার পর বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্য ও দেশবরেণ্য ব্যক্তিদের মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
ক্যাম্পাস সব খবর















