বিশ্বকাপে মেসি-রোনালদো ছিলেন সন্ত্রাসীদের নিশানায়
ক্রীড়া ডেস্ক, সিভয়েস২৪
ফুটবল মাঠে লড়াইয়ের পাশাপাশি বিশ্বকাপের বাইরে তখন চলছিল আরও ভয়ংকর এক লড়াই। লক্ষ্য ছিল ফুটবলের দুই মহাতারকা—লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তাদের ঘিরে ছিল হামলা ও হত্যার হুমকি। এমনকি আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশের ফাঁস হওয়া একটি নিরাপত্তা নথিতে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সান ও স্প্যানিশ ওয়েবসাইট ইনফরমাসিওন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপ চলাকালে শুধু খেলোয়াড় নয়, রেফারি ও অন্যান্য কর্মকর্তারাও বিভিন্ন ধরনের হুমকির মুখে পড়েছিলেন।
নিরাপত্তা নথি অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা দল ও লিওনেল মেসিই ছিলেন সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তুদের একজন। জর্ডানের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচের আগে ডালাস বিমানবন্দরে একটি ফোন আসে। ফোনকারী দাবি করেন, তিনি আরও দুজনকে সঙ্গে নিয়ে গ্রেনেড ও এআর-১৫ রাইফেলসহ স্টেডিয়ামে হামলা চালাবেন। শুধু তাই নয়, সরাসরি মেসিকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়।
ঘটনা এখানেই শেষ নয়, মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক ব্যক্তি দাবি করেন, শরীরে বোমা বেঁধে আটলান্টার স্টেডিয়ামে ঢুকে মেসিকে লক্ষ্য করে আত্মঘাতী হামলা চালাবেন তিনি।
এরপর আসে আরও একটি আতঙ্কজনক ফোন। স্টেডিয়ামের ডাস্টবিনে তিনটি বোমা রাখা হয়েছে বলে পুলিশকে জানানো হয়। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় তল্লাশি। বিস্ফোরক শনাক্তকারী বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে পুরো এলাকায় অভিযান চালানো হয়।
পর্তুগিজ তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও ছিলেন নিরাপত্তা ঝুঁকিতে। ফিফার এক কর্মকর্তা নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের জানান, এক ব্যক্তি রোনালদো যে হোটেলে অবস্থান করছিলেন, সেই হোটেলের বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করছিলেন।
আরেক ঘটনায় পুলিশের নজর এড়িয়ে এক ভক্ত রোনালদোর হোটেলের লিফটে ওঠার চেষ্টা করেন। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি জানান, রোনালদোর সঙ্গে একটি সেলফি তোলাই ছিল তার উদ্দেশ্য। তবে নিরাপত্তার দৃষ্টিতে ঘটনাটি মোটেও হালকাভাবে নেওয়া হয়নি।
বিশ্বকাপে শুধু তারকা ফুটবলাররাই হুমকির মুখে ছিলেন না। ম্যাচের সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষুব্ধ সমর্থকদের নিশানায় পড়েছিলেন রেফারিরাও। আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া ল্যাটেক্সিয়েরকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হয় ছয় হাজারের বেশি হুমকিবার্তা। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) উইলি দেলাজোদকেও হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে গোল মিস করেও খেলোয়াড়রা বিপদে পড়েন। কখনো কখনো একটি ভুলই হয়ে উঠেছিল মৃত্যুর কারণ। অন্তত হুমকির ক্ষেত্রে।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে গোলের সুযোগ নষ্ট করার পর নরওয়ের আলেকজান্ডার সরলথ ও কলম্বিয়ার ঝন জামিনতন কাম্পাজকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, কলম্বিয়ান ফুটবলার কাম্পাজ জাতীয় দলের সঙ্গে দেশে ফিরতেও অনীহা প্রকাশ করেন।
এই ঘটনা ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের ভয়াবহ স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। সে সময় আত্মঘাতী গোলের পর কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবারকে হত্যা করা হয়েছিল।
একের পর এক হুমকির ঘটনায় বিশ্বকাপের নিরাপত্তাব্যবস্থা কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ইংল্যান্ডের মিডিয়া সেন্টার কার্যত দুর্গে পরিণত করা হয়েছিল। তিন স্তরের নিরাপত্তাবেষ্টনী, স্নাইপার-প্রতিরোধী পর্দা এবং ড্রোন হামলা ঠেকাতে ‘নো-ফ্লাই জোন’ চালু করা হয়েছিল।
ফাঁস হওয়া নিরাপত্তা নথির তথ্য বলছে, মাঠের উত্তেজনার আড়ালে বিশ্বকাপজুড়ে নিরাপত্তা কর্মকর্তাদেরও মোকাবিলা করতে হয়েছে একের পর এক গুরুতর হুমকি। ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকাদের ঘিরে সেই আতঙ্কের খবর এখন প্রকাশ্যে আসায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক ক্রীড়া আসর কতটা নিরাপদ ছিল?
খেলাধুলা সব খবর















