কেন অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহাল চান চুয়েটের শিক্ষার্থীরা?
সিভয়েস২৪ ডেস্ক
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে দ্বিতীয় দিনের মতো আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা।
মাত্র ৫৬ দিন দায়িত্ব পালনের পর তাকে সরিয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার পরই এই আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, এত অল্প সময়ের একজন উপাচার্যকে কেন তারা পুনর্বহাল চাইছেন?
বুধবার সংবাদ সম্মেলনে এসে সেই প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
কী ঘটেছে?
গত ২৭ জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম।
এর ৫৬ দিনের মাথায়, সোমবার খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অধ্যাপক সায়েমকে সরিয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সোমবার রাতেই আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার তারা ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেন। এতে চুয়েটের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বুধবারও আন্দোলন অব্যাহত রাখেন তারা।
৫৬ দিনেই কেন আস্থা তৈরি হলো?
শিক্ষার্থীদের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, অধ্যাপক সায়েমের প্রতি তাদের সমর্থন কেবল উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের ৫৬ দিনের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করছে না।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা বলেন, এই সময়ের মধ্যে তারা তার নেতৃত্বের যে ধরন দেখেছেন, সেটিকে ২০০৫ সালে চুয়েটে শিক্ষকতা শুরু করার পর থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে তার কাজের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন।
তাদের ভাষায়, এটি কোনো ব্যক্তির প্রতি ‘অন্ধ আনুগত্য’ নয়। বরং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তৈরি হওয়া আস্থা, দৃশ্যমান কিছু উদ্যোগ এবং শুরু হওয়া কাজগুলো অব্যাহত রাখার বিষয়।
কারণ ১: শিক্ষার্থীদের কাছে সহজে পৌঁছানো
শিক্ষার্থীদের প্রথম যুক্তি হলো, দায়িত্ব নেওয়ার পর অধ্যাপক সায়েম তাদের জন্য সহজলভ্য প্রশাসক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থী মাহতাব হক বলেন, তিনি শিক্ষার্থীদের সমস্যা শুনেছেন, সরাসরি কথা বলেছেন এবং কোনো বিষয় জানানো হলে সেটি গুরুত্ব দিয়ে দেখে সমাধানের চেষ্টা করেছেন।
শিক্ষার্থীদের দাবি, এই সরাসরি সম্পৃক্ততার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তার সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়।
কারণ ২: বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরিতে আগের ভূমিকা
শিক্ষার্থীরা অধ্যাপক সায়েমের উপাচার্য হওয়ার আগের কাজগুলোকেও তাদের দাবির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে চুয়েটে শিক্ষকতা শুরু করার পর তিনি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছেন।
শিক্ষার্থীদের দাবি, তার প্রচেষ্টায় নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ায় চুয়েটের অনেক শিক্ষার্থী পূর্ণ বৃত্তিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন।
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক সায়েম নিজেও জানিয়েছেন, প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থীকে পূর্ণ বৃত্তিসহ বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যেতে তিনি সহায়তা করেছেন বলে শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন।
কারণ ৩: শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সুযোগ তৈরির উদ্যোগ
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অধ্যাপক সায়েমের উদ্যোগে ইতালির আন্তর্জাতিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ড্যানিয়েলি চুয়েটের পাঁচ সাবেক শিক্ষার্থীকে প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল।
উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তার পরিকল্পনার কেন্দ্রে ছিল শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক শিক্ষা, গবেষণা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো।
শিক্ষার্থীরা তার যেসব পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
আন্তর্জাতিক কোলাবরেশন অফিস চালু
বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় বাড়ানো
আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের সুযোগ সম্প্রসারণ
বিদেশি শিক্ষার্থী চুয়েটে আনার উদ্যোগ
আধুনিক গবেষণা হাব ও স্মার্ট ক্লাসরুম
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা, ইন্টার্নশিপ ও কর্মসংস্থানের সংযোগ
অ্যালামনাই নেটওয়ার্ককে আরও কার্যকর করা
শিক্ষার্থীদের দাবি, এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল চুয়েটের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্বমানের শিক্ষা, গবেষণা, বৃত্তি ও চাকরির সুযোগ তৈরি করা।
কারণ ৪: দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়েছিল
শিক্ষার্থীরা শুধু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা নয়, দায়িত্ব পালনের সময় শুরু হওয়া কিছু উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেছেন।
শিক্ষার্থী সাকিব হাসান বলেন, অধ্যাপক সায়েমের দায়িত্ব পালনকালে চুয়েটের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ক্লাব ফেস্ট আয়োজনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ডিফেন্স অ্যানালাইসিস অ্যান্ড রিসার্চ উইং’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছিল।
বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও স্কলারশিপের সুযোগ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরির উদ্যোগও চলছিল বলে দাবি করেন তারা।
৫৬ দিন কি মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট?
এখানেই শিক্ষার্থীদের যুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
তারা নিজেরাই স্বীকার করছেন, একজন উপাচার্যের পূর্ণ মেয়াদের কাজ মূল্যায়নের জন্য ৫৬ দিন যথেষ্ট নয়।
তবে তাদের বক্তব্য, একজন প্রশাসক শিক্ষার্থীদের কথা শুনবেন কি না, সমস্যা জানালে তা সমাধানের চেষ্টা করবেন কি না, সংকটে পাশে দাঁড়াবেন কি না এবং নিজের অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীদের সুযোগ তৈরি করবেন কি না, সেই মানসিকতা বোঝার জন্য ৫৬ দিন একেবারে অপ্রতুল নয়।
মাহতাব হকের ভাষ্য, এই সময়ের মধ্যেই তারা অধ্যাপক সায়েমের মধ্যে এমন মানসিকতার প্রতিফলন দেখেছেন।
নতুন উপাচার্যকে নিয়ে কি আপত্তি?
শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে নতুন দায়িত্ব পাওয়া অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের ব্যক্তিগত বা একাডেমিক যোগ্যতা নিয়ে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়নি।
মাহতাব হক বলেন, সদ্য নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির যোগ্যতা নিয়ে তারা কোনো নেতিবাচক সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন না।
তাদের আপত্তির জায়গা হলো, হঠাৎ করে অধ্যাপক সায়েমকে সরিয়ে দেওয়ার ফলে তার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের তৈরি হওয়া আস্থা এবং চলমান উদ্যোগগুলো থেমে যেতে পারে।
তাহলে শিক্ষার্থীদের মূল দাবি কী?
শিক্ষার্থীদের বক্তব্যকে সংক্ষেপ করলে তাদের দাবি তিনটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
এক. অধ্যাপক সায়েম শিক্ষার্থীদের কাছে সহজলভ্য ও শিক্ষার্থীবান্ধব প্রশাসক হিসেবে আস্থা তৈরি করেছেন।
দুই. উপাচার্য হওয়ার আগেও তিনি বিদেশে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করেছেন বলে তারা দাবি করছেন।
তিন. উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার কিছু শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, যেগুলো তারা অব্যাহত দেখতে চান।
এই কারণগুলো সামনে রেখেই অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে চুয়েটের উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষা সব খবর














