বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ : চিন্তাবিদ ও লেখক আহমদ ছফা
রশীদ এনাম
‘তুমি এলোমেলো ধ্বনিপুঞ্জে মুকুলিত সঙ্গীত সুন্দর
জোছনারাতে উচ্চারিত অমলিন আকাঙ্ক্ষার স্বর।
তুমি পাহাড়ে পাথর ছোঁয়া ফটিক জলের নদী
মন-পবনের নাও পূবাল হাওয়ায় ভেসে যাওয়া নিরবধি’-আহমদ ছফা।
পৃথিবী থেকে সাপ এবং শকুনের বিশেষ প্রজাতি বিলুপ্ত হলে কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না। একেক ধরনের মানুষের মধ্যে এই সাপ-শকুনেরা নতুন জীবন লাভ করে বেঁচে থাকবে। মাঝে মাঝে ভাবি, চাষারা লাঙলের মুঠি ধরে দেশটা টিকিয়ে রেখেছে। না হলে অসাধু আমলা, দুর্নীতিবাজ, রাজনীতিক এবং ফটকা ব্যবসায়ীরা দেশের সমস্ত মাটি মণ মেপে বিদেশে চালান দিত। — (গাভি বৃত্তান্ত)
আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যখন রক্ত দিয়েই চিন্তা করাতে বাধ্য হচ্ছি। চারদিকে এত অন্যায়, অবিচার, এত মূঢ়তা ও কাপুরুষতা ওৎ পেতে আছে যে, এ ধরনের পরিবেশে নিতান্ত সহজে বোঝা যায়—এই কথাও চেঁচিয়ে না বললে কেউ কানে তোলে না। (বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস) — কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফার উক্তিগুলো সত্যিই হৃদয় স্পর্শ করে।
লেখক আহমদ ছফা ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হেদায়েত আলী ওরফে ধন মিয়া ছিলেন পেশায় একজন কৃষক এবং মাতা আসিয়া খাতুন। দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে আহমদ ছফা ছিলেন দ্বিতীয়।
লেখক আহমদ ছফা তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন দক্ষিণ গাছবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। এরপর তিনি ভর্তি হন গাছবাড়িয়া নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে, যেখানে ১৯৫৭ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা উত্তীর্ণ হন।
তারপর চট্টগ্রামের নাজিরহাট কলেজ থেকে ১৯৬২ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর তিনি বোয়ালখালী কানুনগো পাড়া স্যার আশুতোষ কলেজে স্নাতকের কিছু সময় পড়াশোনা করেন।
পরীক্ষা বর্জন করলেও শেষে ১৯৬৭ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে স্নাতক পাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অনার্স পড়াশোনা শুরু করেন, কিন্তু পরীক্ষা বর্জন করেন। ১৯৭১ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

তারপর জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক স্যারের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি গবেষণা শুরু করেন, যা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। পাশাপাশি তিনি জার্মান ভাষায় ডিপ্লোমা লাভ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বল্পকালের জন্য অধ্যাপনাও করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি লেখালেখি শুরু করেন। তিনি ছাত্র ইউনিয়ন, কৃষক সমিতি এবং কমিউনিস্ট পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। কৃষক আন্দোলন সংগঠনে সক্রিয় থাকাকালে কারাবরণও করেছেন।
দৈনিক গণকণ্ঠ ও সাপ্তাহিক উত্তরণ ও উত্থান পর্বে নিয়মিত লিখতেন। উত্থান পর্বের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং উত্তরণের প্রধান সম্পাদক ছিলেন তিনি।
লেখালেখি ও সম্পাদনায় তার স্বচ্ছতা, সাহস ও স্পষ্টবাদিতার কারণে তিনি সাংবাদিক মহলে বাংলাদেশের উজ্জ্বল এক দীপ্তিমান মেধাবী লেখক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
লেখক আহমদ ছফা ছিলেন বাংলাদেশ লেখক শিবিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বাংলা-জার্মান সম্প্রীতির সাধারণ সম্পাদক।
লেখক আহমদ ছফা অর্ধশতাধিক বই রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘বরুমতির আঁকেবাঁকে’। প্রবন্ধসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— জাগ্রত বাংলাদেশ, বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, বাংলা ভাষা, রাজনীতির আলোকে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা, বাঙালি মুসলমানের মন, শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য প্রবন্ধ, রাজনীতির লেখা, নিকট দূরের প্রসঙ্গ, সংকটের নানা চেহারা, সাম্প্রতিক বিবেচনা, বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, শান্তিচুক্তি ও নির্বাচিত প্রবন্ধ, বাঙালি জাতি এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্র, আমার কথা ও অন্যান্য প্রবন্ধ, সেই সব লেখা ইত্যাদি।
উপন্যাস হিসেবে তিনি রচনা করেছেন—‘সূর্য তুমি সাথী’, ‘উদ্ধার’, ‘একজন আলী কেনানের উত্থান পতন’, ‘অলাতচক্র’, ‘ওঙ্কার’, ‘গাভীবিত্তান্ত’, ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’, ‘পুষ্পবৃক্ষ ও বিহঙ্গপুরাণ’, ‘নিহত নক্ষত্র’।
কবিতার বই হিসেবে উল্লেখযোগ্য হলো—‘জল্লাদ সময় ও দুঃখের দিনের দোহা’, ‘একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা’, ‘লেনিন ঘুমাবে এবার’, ‘আহিতাগ্নি’।
তাঁর রচনায় রয়েছে কিশোর গল্প, শিশুতোষ ছড়া, ভ্রমণকাহিনি, লোকজন ভাষার ব্যবহার, পুঁথিপুরাণের শব্দ প্রয়োগ ও বাক্য রীতির সঠিক চয়ন।
অন্যদিকে, অনুবাদ করেছেন তিনি জার্মান কবি গ্যোতের ‘গুতের ফাউস্ট’ ।
আহমদ ছফার লেখা উপন্যাস, গল্প ও প্রবন্ধগুলো যারা গভীরভাবে পড়েছেন, তারা সত্যিকারের পাঠক হলে তাঁর সম্পর্কে জানার পিপাসা আপনাকে পেয়ে বসবে। লেখক আহমদ ছফা একাধারে ছিলেন বইপ্রেমী, প্রকৃতি প্রেমী এবং একজন সত্যিকারের মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক মানুষ হিসেবে যাঁকে দেখে মুগ্ধ হতে হয়।
ষাটের দশকে যখন আহমদ ছফা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, তখন ঢাকায় এক ধরনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলছিল। সেই সময় তিনি এক বন্ধুর সঙ্গে পুরান ঢাকার এক হিন্দু বাড়ি পাহারা দিতে গিয়েছিলেন। সারারাত জেগে সেই বন্ধুর আত্মীয়ের বাড়ি পাহারা দিয়েছিলেন তিনি।
আহমদ ছফা শুধু লেখালিখি, গবেষণা বা শিক্ষকতায় সীমাবদ্ধ থাকেননি, তিনি একজন মানবিক মানুষ হিসেবেও শিল্পীর প্রতি গভীর ভালোবাসার হাত বাড়িয়েছিলেন।
নিজে লেখক ও চিত্রশিল্পীদের নান্দনিকভাবে জনসমক্ষে উপস্থাপন করেছেন। নড়াইলের চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের আঁকা ছবি প্রদর্শনী আয়োজন থেকে শুরু করে এর প্রচার-প্রসার সবকিছু নিজের উদ্যোগে করে গেছেন তিনি।
গল্প জাদুকর লেখক হুমায়ুন আহমেদকে তাঁর জিয়ন কাঠির আলোতে উদ্ভাসিত করেছেন আহমদ ছফা। হুমায়ুন আহমেদকে লেখালেখির বিভিন্ন সময়ে পরামর্শ ও অনুপ্রেরণা দিতে কখনো কৃপণতা করেননি।
হুমায়ুন আহমেদের প্রথম উপন্যাস “নন্দিত নরকে” পাণ্ডুলিপি নিয়ে নিজে প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে গিয়েছিলেন আহমদ ছফা। নতুন লেখকের বই হওয়ায় তখন কেউ ছাপাতে রাজি ছিলেন না।
তবুও আহমদ ছফা নিজে উদ্যোগ নিয়ে খান ব্রাদার্স এন্ড কোং প্রকাশককে বুঝিয়ে বলে, ‘নন্দিত নরকে’ বইটির প্রকাশের দায়িত্ব অনেকটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। বইটি প্রকাশের পর নিজেই সেটি মানুষের মাঝে প্রচারের জন্য পাঠক ও জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন।
লেখক হুমায়ুন আহমেদ লিখেছেন, ‘নন্দিত নরকে বই আকারে প্রকাশের সব ব্যবস্থা তিনি (আহমদ ছফা) করে দিয়েছেন। সাহিত্যের কঠিন মাটিতে আমাকে শক্ত করে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তিনি দূরে সরে গেছেন।’
শুধু তাই নয়, আহমদ ছফা ছিলেন লেখক হুমায়ুন আহমেদের পরিবারের একজন সদস্যের মতো। ১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতার পর একাত্তরের শহীদ ফয়জুর রহমানের স্ত্রী শহীদ জায়া আয়েশা ফয়েজ এবং তাদের সন্তানদের বাবর রোডের বাসা থেকে রক্ষীবাহিনীরা কম্বল, হাঁড়ি-পাতিলসহ বের করে দেন। সবাই রাস্তায় রাতভর বসে ছিলেন।
পরদিন খবর পেয়ে আহমদ ছফা কেরোসিনের টিন নিয়ে আগন্তুকের মতো এসে প্রতিবাদ করেন— ‘শহীদ পরিবারকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে জ্ঞানীর কলমের চেয়েও পবিত্র রক্তকে অবমাননা করা হয়েছে। স্বাধীনতা ও জাতির আত্মদানের গৌরবমণ্ডিত ঐশ্বর্যকে অপমান করা হয়েছে।’
রেগে অগ্নিশর্মা প্রতিবাদ করার জন্য তিনি লেখক হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে গণভবনে যাবার প্রস্তুতি নেন এবং শহীদ পরিবারকে অপমানের দায়ে নিজেই গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মাহুতি দেয়ার হুমকি দেন।
এই খবর ছড়িয়ে পড়লে কবি সেকান্দার আবু জাফর এসে আহমদ ছফাকে ধমক দিয়ে বলেন, ‘শহীদ পরিবারের জন্য ব্যবস্থা নেবেন’। পরবর্তীতে লেখক হুমায়ুন আহমেদের পরিবার আগের বাসায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ পান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ কবি আবুল হাসান ভর্তি হওয়ার জন্য টাকা সংগ্রহ করতে না পেরে বিপাকে পড়েছিলেন। খবরটি শুনে আহমদ ছফা নিজের লেখা বইয়ের রয়্যালটির টাকা তাঁকে দিয়ে দেন।
তরুণ কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ আলসারে আক্রান্ত হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে আর্থিক সহযোগিতা করেন।
একবার আর্মিদের হাতে কবি নির্মলেন্দু গুণ গ্রেপ্তার হওয়ার খবর শুনে দ্রুত রমনা থানায় ছুটে যান আহমদ ছফা। সেখানে গিয়ে তিনি থানার ওসির সঙ্গে তুমুল বাকবিতণ্ডা করেন এবং আপোষহীন ভঙ্গিতে দাবি জানিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্মলেন্দু গুণকে মুক্ত করে আনেন।
এছাড়া কবি অসিম সাহা এমএ পরীক্ষা দেয়ার সময় তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন ভালোবাসা ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাজমা শাহিনের বিয়েতেও তিনি আর্থিক সহযোগিতা করেছেন।
এই রকম অসংখ্য লেখক, কবি, সাহিত্যিক এবং বুদ্ধিজীবীদের বিভিন্ন সময়ে নিরবে-নিভৃতে সহযোগিতা করে গেছেন আহমদ ছফা। তিনি ছিলেন সত্যিকারের মানবিক মানুষ এবং শিল্প-সাহিত্যের নির্ভরতার আশ্রয়।
লেখক আহমদ ছফা শুধু একজন লেখক, দার্শনিক বা কথাসাহিত্যিকই নন, তিনি ছিলেন একজন মহৎ ও পরোপকারী মানবিক মানুষ। তিনি সবসময় নিষ্পেষিত মানুষের পাশে দাঁড়াতেন এবং তাদের প্রতি ভালোবাসার হাত প্রসারিত করতেন।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক মানুষের ঘরবাড়ি সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যায়। সেই ভয়াবহ দুর্যোগে তিনি বাংলা-জার্মান সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহায়তায় প্রায় একশ’ পরিবারের জন্য ঘর পুনর্নির্মাণ করে দেন।
এছাড়াও গ্রামের দরিদ্র ও গরিব ছাত্র এবং আত্মীয়-স্বজনদের জন্য আহমদ ছফা মাসে মাসে টাকা পাঠাতেন। আত্মীয়-স্বজনের পড়ালেখার খরচসহ নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন অকৃত্রিম আন্তরিকতায়।
সত্যিই সে সময়ের জন্য এটি ছিল এক মহৎ ও পরোপকারীর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আমাদের লেখক আহমদ ছফা শুধু সাহিত্য নয়, মানবিকতার ক্ষেত্রেও অনন্য হয়ে থাকবেন।
বাংলাদেশে আহমদ ছফার মতো মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন, সাহসী ও স্পষ্টবাদী লেখক পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। মানবিক সাহিত্যের আলোয় তিনি অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফা।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখে গেছেন, কথা বলেছেন সমাজ, সাহিত্য ও মানুষের পক্ষে।
মৃত্যু নিয়ে আহমদ ছফা বলেছিলেন, ‘মৃত্যু হলো শোকের চেয়েও প্রয়োজনীয়। মৃত্যু জীবিতদের জন্যে স্পেস সৃষ্টি করে। মৃত্যু সৃষ্ট জীবের কলুষ কালিমা হরণ করে। মৃত্যু জীবনকে শুদ্ধ এবং পবিত্র করে।’
জীবনের প্রতি তাঁর কোনো মোহ ছিল না। নিয়ম-কানুন মানার ধার ধারতেন না। খাওয়া-দাওয়া ঠিক মতো করতেন না, নিজের শরীরের প্রতিও ছিল উদাসীনতা।
২০০১ সালের ২৮ জুলাই, বাংলাদেশের ‘সক্রেটিস’ খ্যাত কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফা সবাইকে কাঁদিয়ে চিরতরে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। সাহিত্য-সংস্কৃতির আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ও বিচিত্র এই দার্শনিকের শেষ ঠিকানা—মিরপুর কবরস্থানের ব্লক ‘ক’, ২৮ নম্বর লাইন, ১০৮৫ নম্বর সাড়ে তিন হাত মাটির কুটির।
তাঁর কবরের নকশা করেন শিল্পী রশীদ তালুকদার এবং কবরের ইট ক্রয়ের অর্থ সহায়তা দেন সিলেটের ওবেইদ জায়গীরদার।
লেখক আহমদ ছফার সমাধিটি এতই সুন্দর! লাল টালি ইটের ঘেরা চারপাশ, মাঝখানে সবুজ দূর্বাঘাসের মখমলি চাদর, পাশে কামিনী ফুলের গাছ। দেখে মুগ্ধ হয়ে ভাবলাম—দেশের মানুষ প্রকৃতিপ্রেমী, স্পষ্টবাদী এই লেখক ও বুদ্ধিজীবীকে হয়তো যথাযথভাবে চিনতে পারেনি, কিন্তু প্রকৃতি ঠিকই তাঁকে চিনেছে। প্রকৃতি যেন তাঁর নিজস্ব রঙের তুলি দিয়ে এই সমাধিকে সাজিয়ে দিয়েছে।
সমাধির এপিটাফে যখন ঝাপসা চোখে পড়ছিলাম—
‘আমার কথা কইবে পাখি করুণ করুণ ভাষে।
আমার দুঃখ রইবে লেখা শিশির ভেজা ঘাসে।
আমার গান গাইবে দুঃখে পথ হারানো হাওয়া।
আমার নাম বলবে মুখে মেঘের আসা যাওয়া।
ইন্দ্রধনু লিখবে লিখন কেমন ভালোবাসে।
দীঘল নদী করবে রোদন সমাধিটির পাশে’
-লেখক আহমদ ছফা।
চোখের কোণে কখন যে জল গড়িয়ে পড়লো, টেরই পেলাম না। বর্তমান প্রজন্মের দাবি একটাই— কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফাকে যেন মৃত্যুর পর বাংলা একাডেমি পদকসহ যথাযথ সম্মাননা দেওয়া হয়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আজও সাহিত্যিক আহমদ ছফার নামে তাঁর গ্রামের কোনো স্মৃতি সংরক্ষণ হয়নি। অথচ, জার্মানির ভেৎসলার শহরে, যেখানে মহাকবি গ্যোতের স্মৃতি বিজড়িত, সেখানে আহমদ ছফার নামে একটি কিয়স্ক (পানশালা) নামকরণ করা হয়েছে। এটি সমগ্র বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয়।
সাহিত্যিক আহমদ ছফাকে অবশ্যই জার্মানবাসী স্মরণ করে রেখেছে, কিন্তু আমাদের দেশে তাঁর কোনো স্মৃতি সংরক্ষণ হয়নি। চট্টগ্রামের চন্দনাইশ থানার কত জনপ্রতিনিধি এলেন, গেলেন—কেউই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি। আহমদ ছফার স্মৃতিবিজড়িত দক্ষিণ গাছবাড়িয়া গ্রামে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ করা এখন সময়ের অতি জরুরি দাবি।
লেখক আহমদ ছফার ৮২তম জন্মবার্ষিকীতে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং চন্দনাইশ উপজেলা প্রশাসনের প্রতি আমাদের সবিনয় নিবেদন— আহমদ ছফা স্মৃতিবিজড়িত দক্ষিণ গাছবাড়িয়ায় তাঁর নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাঠাগার ও সড়কের নামকরণ করা হোক। সাথে চট্টগ্রামে দক্ষিণ গাছবাড়িয়ার সাহিত্যপাড়ায় ‘আহমদ ছফা একাডেমি’ স্থাপনের জোর দাবি জানাচ্ছি।
রশীদ এনাম
লেখক ও প্রাবন্ধিক
কলম সব খবর















