গ্রীষ্মের কানাডা এবং আমার প্রথম বাগান
লিখেছেন : ফারুক মো. সিদ্দিকী
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫। অটোয়ার আকাশ আজ নীলচে সাদা তুলোর মতো মেঘে ঢাকা। ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দেয়া রোদটুকু উষ্ণ—একেবারে সেপ্টেম্বরের শেষ গ্রীষ্মের মতো। আজ ঠিক দুই মাস হলো আমি কানাডায়; আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে অটোয়ায় এসেছি।
কানাডায় এ আমার পঞ্চম আগমন। প্রতিবারই মূল অবস্থান অটোয়ায়। তবু প্রতিবার কানাডা যেন নতুন পোশাক পরে আমার সামনে আসে।
মনে পড়ে প্রথমবারের কথা, ১৯৮৫ সাল। আমি তখন রেলওয়ে অ্যাকাউন্টস এর মরহুম এস এম হাবিবুর রহমান স্যার এর সঙ্গে মিশন অডিটে এসেছিলাম। শীতের কনকনে বাতাসে আমরা হেঁটে বেড়াতাম; স্যারের স্নিগ্ধ ভঙ্গি আর হাসি এখনো মনে আছে। এরপর আরও কয়েকবার এলেও, এবারের সফর যেন একেবারেই অন্যরকম।
১৪ জুন, ২০২৫। ছোট বোনের অটোয়ার বাড়িতে পৌঁছলাম। এয়ারপোর্টে জড়িয়ে ধরে ছোট বোন আমাকে বললো,
“দাদা, আপনি একেবারে সঠিক সময়ে এসেছেন ! আজ থেকেই আমাদের ‘most awaited ’ summer শুরু।”
পরদিন ওর বাড়ির পেছনের উঠানে গিয়ে দেখি, সব কিছু এলোমেলো অথচ প্রাণবন্ত—মাটি উল্টে রাখা, বীজের প্যাকেট ছড়ানো, প্লাস্টিকের ট্রে-তে চারাগাছ সারি সারি। বোন আর ভগ্নিপতি দুজনেই হাত মাটিতে ডুবিয়ে ব্যস্ত। সামার বাগানের আয়োজন।
আমি হেসে বললাম,
“আমি কিন্তু কোনোদিন এসব করিনি।”
বোন চোখ তুলে বলল,
“এবার করে দেখুন , মজা পাবেন ।”
আমাদের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়ায় সারাজীবন সবজি বাগান দেখেছি, কিন্তু কখনো হাত লাগাইনি। বীজ বপনের সেই ছোট্ট উত্তেজনা, গাছ বড় হওয়ার প্রতিদিনের আনন্দ—এসব যেন আমার জীবনের বাইরে ছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে হলো—এখন না হলে আর কবে?
শুরুর দিকে কয়টা মাচাং এর খুঁটি পুঁতে দিলাম। দিন যত গড়াল, আমি যেন এই বাগানেরই একজন হয়ে উঠলাম। প্রতিদিন সকালবেলা কফি হাতে বেরিয়ে গিয়ে গাছগুলোর দিকে তাকাতাম, একে কি বলে? “সবুজের নেশা”।
দেড় মাসের মাথায় বাগান যেন উৎসবের সাজে সেজেছে —আজমেরীর (বিসিএস অডিট এন্ড একাউন্টস ক্যাডারের সহকর্মী) ছাদ বাগানের মতো অতটা সমৃদ্ধ নয়, তবু আমার চোখের সামনে একটি বাগান—শূন্য থেকে পূর্ণতা—প্রথমবারের মতো জন্ম নিল। আর আমি উপভোগ করলাম নিজের হাতে গড়া অর্গানিক সবজির স্বাদ।
টমেটোর লাল গাল, কাঁচা মরিচের চিকন সবুজ হাসি, বেগুনের বেগুনি আভা, এক/দেড় কেজি সাইজের কচি লাউ ঝুলছে লতার ফাঁকে ফাঁকে। শসার খোসা রোদের আলোয় ঝিলমিল করছে, লাল শাক আর পুঁই শাকের লাল সবুজ পাতায় শিশিরের দাগ, ক্যাপসিকামের রঙ যেন রঙতুলির আঁচড়।
প্রথম ফসল তোলার দিনটিকে আজও মনে করি, যদিও ছবি তুলতে ভুলে গেছি। দিন দিন অপেক্ষার পর এক সকালে যখন লাউ কেটে হাতে নিলাম, মনে হলো যেন জীবনে এক মহৎ কাজে শরিক হলাম।
এর মধ্যে মন্ট্রিল থেকে আমার আরেক ছোট বোন কয়েকবার এসেছে। আজও এসে বলল, “দাদা, আপনার এই বাগানের গল্প মন্ট্রিলে পৌঁছে গেছে।”
আমি হেসে বললাম,
“তাহলে এবার ওখানেও একটা শুরু করতে হবে।”
কানাডা, বিশেষ করে অটোয়া, আমার কাছে এক স্বপ্নের দেশ। সিটি হলেও যেন সাজানো-গোছানো পরিপাটি এক সুবিশাল গ্রাম—শান্ত, ছিমছাম, আর মানুষের আন্তরিকতায় ভরা। সকালবেলা রাস্তার ধারে সূর্যের আলোয় গাছের ছায়া, পাখির ডাক—এসবের মধ্যে সময় এখানে উড়ে যায়। চোখের পলকে দুই মাস কেটে গেল।
অক্টোবরের শেষ দিকে দেশে ফেরার আগে লন্ডনে মেয়ের বাসায় এক থেকে দেড় মাস থাকার আশা আছে। লন্ডন এখন আগের মতো আমাকে টানে না —ভিড়, কোলাহল, ব্যস্ততা। তবু যাবো, কারণ ওখানে আমার মেয়ে, জামাই, আর আদরের নাতি আছে।
এই সফরের কথা ঢাকায় থাকা আমার দুই মেয়ে ছাড়া কাউকে জানানো হয়নি। জানানোরই বা কি আছে! আমার বিসিএস ফোরামেও জানায়নি। তাই ভাবছি, এই লেখাটা ওখানেও শেয়ার করব।
এই লেখাটা নিছক ভ্রমণ বৃত্তান্ত নয়—এ যেন আমার জীবনের প্রথম বাগানের গান, কানাডার গ্রীষ্মের গন্ধে মাখা এক স্মৃতিকথা।
লেখক : সাবেক কন্ট্রোলার জেনারেল অব একাউন্টস (সিজিএ)।
কলম সব খবর















