শৈশব দারিদ্র্যে নজর দেয়া জরুরি, প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
লিখেছেন : ফারহানা ইয়াসমিন
Multidimensional Poverty Index হলো এমন একটি পরিমাপ যা দ্বারা আয় ব্যতীত স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মানের একাধিক বঞ্চনা বিবেচনা করে দারিদ্র্যের মূল্যায়ন করা হয়। শিশুরা যখন এই বঞ্চনার ভুক্তভোগী হয় তখন তাকে বলা হয় শৈশব দারিদ্র্য।
সম্প্রতি GED (General Economics Division) এর হিসেবে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের ঘটনা প্রাপ্তবয়স্কদের (২১.৪৪%) তুলনায় শিশুদের (২৮.৭০%) বেশি। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ শিশু। এবং এই শিশুদের মধ্যে প্রতি দশজনে তিনজন শিশুর অবস্থান বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মাঝে।
শৈশব দারিদ্র্য অবশ্যই উন্নয়নের পথে অন্তরায়, যা কমাতে পারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং চক্রাকারভাবে বিবিধ সমস্যা ঘটাতে পারে। শিশুদের যখন মানসিক, শারীরিক বিকশিত হওয়ার সময় তখন দারিদ্র্যের প্রভাবে বিকাশগত নানাবিধ ঘটনার সম্মুখীন হয়ে থাকে। অপ্রতুল জ্ঞান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ঘটনা গুলো ডেকে আনে দীর্ঘমেয়াদী অনুন্নয়ন। এছাড়াও শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পদার্পনের ফলে শৈশবের তিক্ত অভিজ্ঞতা, অপুষ্টি বেকারত্ব বা কম মজুরির কাজের উৎস হতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শৈশব দারিদ্র্যের উপর একটি জরিপে দেখা গেছে যে দারিদ্র্য হ্রাসে ব্যয় করা প্রতিটি ডলার অর্থনৈতিক ব্যয়ে সাত ডলার সাশ্রয় করেছে। এছাড়াও যুক্তরাজ্যে অনুমান করা হয়েছে যে শৈশব দারিদ্র্যের ফলে যে ক্ষতি হয় তা প্রতি বছর ১২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির সমতুল্য, যা জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ।
বাংলাদেশের মত স্বল্পোন্নত দেশে যদি এই শৈশব দারিদ্র্যের উপর বিশেষ নজর না দেওয়া হয় তাহলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিশেষভাবে শৈশব দারিদ্র্য মানব সম্পদ উন্নয়ন কমায় কারণ শিশু শিক্ষা হতে বঞ্চিত হয় বা পারিবারিক সচেতনতায় অভাবে বিদ্যালয়ে নিয়মিত অংশগ্রহণ কম হতে পারে। অপুষ্টিজনিত কারণে স্বাস্থ্য সেবায় খরচ বাড়তে পারে, যার ফলে সম্পদের বণ্টনে অসমতা দেখা দিতে পারে। এছাড়াও গ্রামে এখনো দেখা যায় ছেলে সন্তানের জন্য চিকিৎসা করাতে মেয়ে সন্তানের তুলনায় বেশি আগ্রহী হয়ে থাকেন পিতামাতা; ফলে মেয়েদের স্বাস্থ্য সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে। অন্যদিকে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র সামাজিক অবক্ষয়ের জন্য হুমকিস্বরূপ, সামাজিক নিরাপত্তা প্রদানের জন্য নেওয়া বিভিন্ন সোশ্যাল সিকিউরিটিতে ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, যা বাজেট ঘাটতি সৃষ্টি করে।
তাই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে অবশ্যই শৈশব দারিদ্র্যের পরিমাপ কমিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। শিশুদের মানসিক, শারীরিক, আর্থিক সকল বিষয়ে বিনিয়োগ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং সম্প্রদায়ের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা প্রদান করে, যা টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখে। GED জরিপে দেখা যায়, নগরের তুলনায় গ্রামে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের সূচক বেশি। অর্থাৎ গ্রামীণ শিশুদের শিক্ষা, চিকিৎসা যদি ভালোভাবে তদারকিতে রাখা যায়, তবে অবশ্যই বাংলাদেশ শৈশব দারিদ্র্য সূচক কমিয়ে কৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের দিকে ধাবিত হবে।
লেখক : লেকচারার, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
কলম সব খবর















