Cvoice24.com

শিল্পী মনসুর কাজীর একক চিত্র প্রদর্শনী `বিমূর্তের সহাবস্থান`

লিখেছেন : জাওয়াদ উল আলম চৌধুরী
১৭:৪৫, ২১ আগস্ট ২০২৫
শিল্পী মনসুর কাজীর একক চিত্র প্রদর্শনী `বিমূর্তের সহাবস্থান`

গত ১১-১৫ জুলাই ২০২৫ ধানমন্ডির শফিউদ্দীন শিল্পালয়ে উদ্ভোধন হলো চিত্রশিল্পী মুহাম্মদ মনসুর কাজীর 'Coexistence of Abstruct' শিরোনামে একক চিত্র প্রদর্শনী। পাঁচ দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীর আয়োজনে শিল্প প্রেমী ও শিল্পবোদ্ধাদের নজরকাড়া উপস্থিতি ছিল। শিল্পী মনসুর অ্যাবস্ট্রাক্ট চিত্ররীতিতে ছবি আঁকতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন।

মনসুর কাজীর জন্ম চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায়। গ্রামেই তার বেড়ে ওঠা ও পড়ালেখা শুরু। পরে তিনি বাংলাদেশ ফরেস্ট কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। শিল্পকলার মোহে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে ভর্তি হয়ে চিত্রকলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে মনসুর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের অধীনে ছাপচিত্র বিষয়ে উচ্চতর গবেষণায় যুক্ত রয়েছেন।

শিল্পী মনসুর তার শিল্পকর্মে নেদারল্যান্ডের শিল্পী পিয়েট মনদ্রিয়ান ও লাটভিয়ার শিল্পী মার্ক রথকোর শিল্পরীতির ধারা অনুসরণ করেছেন। এ দুজন খ্যাতিমান শিল্পী অ্যাবস্ট্রাক্ট শিল্পরীতির জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। মনদ্রিয়ান বিমূর্ত চিত্রকলার অন্যতম পথিকৃত ছিলেন এবং বিংশ শতাব্দীর আধুনিকতাবাদী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর কাজের বৈশিষ্ট্য হলো সরল ও জটিল জ্যামিতিক আকার যেমন- আয়তক্ষেত্র, বর্গক্ষেত্র, নানা আকৃতির কোণ, বৃত্ত ও রেখার যুৎসই মেলবন্ধন। মাঝে মাঝে রেখা (লাইন) মাঝ পথে হারিয়ে যায় আবার কখনো অন্য রেখার সাথে যুক্ত হয়। রঙের ক্ষেত্রে তিনি মৌলিক রঙ (লাল, হলুদ, নীল) বেশি ব্যবহার করতেন। এছাড়া সাদা, কালো ও ধূসর রঙের ব্যবহারও দেখা যায় তাঁর ছবিতে। মনদ্রিয়ানের শিল্পশৈলী 'নিওপ্লাস্টিসিজম' নামে পরিচিত।

অন্যদিকে মার্ক রথকো খ্যাতি অর্জন করেছেন বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদী চিত্রশিল্পী হিসেবে। তাঁর চিত্রকলার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো রঙের বিশাল ক্ষেত্র যা দর্শকের মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। তাঁর কাজগুলি অ্যাবস্ট্রাক্ট, যেখানে কোনো বস্তু বা দৃশ্য সরাসরি উপস্থাপিত হয়নি বরং রঙ এবং আকারের মাধ্যমে ভাব প্রকাশ দেখা যায় বারবার। তাঁর চিত্রকর্মে আবেগ, বিষাদ এবং আধ্যাত্মিক গভীরতার প্রকাশ পায়, যা দর্শকদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

শিল্পী মনসুর কাজীও এ দুজন খ্যাতিমান শিল্পীর কাজের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন প্রায় সব শিল্পকর্মে। মনদ্রিয়ানের মতো উজ্জ্বল রঙ ও রেখার মাধ্যমে তিনি নগরায়নের বৈচিত্র, পরিবেশ, পরিবেশ বিপর্যয়, প্রাকৃতির সৌন্দর্য ও জটিলতার চিত্র চিত্রিত করেছেন এবং তা প্রকাশ করেছেন চিত্রের নানা ফ্রেমে।

অন্যদিকে তার চিত্রে আমরা দেখেছি গ্রামীণ জীবন, নদী, প্রকৃতি ও অবারিত শস্যের খোলা প্রান্তর। তার কয়েকটি ছবিতে ফিগারের উপস্থিতি দেখা যায়, যেমন- দুই মুখ, হালদার ডলফিন এবং দণ্ডায়মান নারীর অবয়ব। তিনি মূলত নন-ফিগারেটিভ কাজ করেন। তার কাজে ফিগারের উপস্থিতি ছবিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

যেহেতু মনসুর গ্রামেই বেড়ে উঠেছেন এবং তার গ্রামের পাশ দিয়ে হালদা নদী বয়ে গেছে, তাই হালদার রূপ-বৈচিত্র তার ছবিতে, রেখায় প্রতিফলিত হয়েছে। তার ছবিতে মনদ্রিয়ান ও রথকোর ধারা লক্ষ্যণীয়। তার ছবিতে উজ্জ্বল রঙ ও রেখার দ্বি-মাত্রিক ও ভূ-মাত্রিক ব্যবহার ছবিকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তার ছবির অন্যতম মাধ্যম হলো তেলরঙ, যা প্রত্যেক চিত্রশিল্পীর জন্য কষ্টসাধ্য, টেকসই এবং দীর্ঘস্থায়ী। তিনি তেলরঙ মার্জিতভাবে ব্যবহার করেছেন। প্রতিটি ছবি দর্শক ও শিল্পমোদীদের আকৃষ্ট করেছে।

এ প্রদর্শনীর উদ্ভোধন করেন বাংলাদেশের খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিল্পী মিজানুর রহিম, শিল্পী আবুল বারাক আলভী এবং শিল্পী সৈয়দ সাইফুল কবীর।

লেখক : শিল্প সমালোচক, পিএইচডি গবেষক, চারুকলা ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।