Cvoice24.com

আকাশে মেসি, চোখে জল: ‘গ্রাসিয়াস লিও’ 

ক্রীড়া ডেস্ক, সিভয়েস২৪
১১:০৩, ৭ অক্টোবর ২০২৬
আকাশে মেসি, চোখে জল: ‘গ্রাসিয়াস লিও’ 

কিছু বিদায় শুধু বিদায় নয়। কিছু বিদায়ের সঙ্গে শেষ হয়ে যায় একটি যুগ, কিন্তু থেকে যায় অসংখ্য স্মৃতি। বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের রাতটিও ছিল তেমন। মাঠে শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সি গায়ে দাঁড়িয়ে লিওনেল মেসি। গ্যালারিজুড়ে প্রায় ৮৫ হাজার মানুষের ঢেউ। কারও হাতে আর্জেন্টিনার পতাকা, কারও চোখে জল, কারও কণ্ঠে শুধু একটি নাম—মেসি।

আর ম্যাচ শেষ হতেই শুরু হলো সেই অপেক্ষার শেষ অধ্যায়। অন্ধকার আকাশে জ্বলে উঠল শত শত আলো। ড্রোনের বর্ণিল নকশায়, আতশবাজির ঝলকে আর সংগীতের আবহে মনুমেন্টাল হয়ে উঠল এক কিংবদন্তির বিদায়মঞ্চ। আর্জেন্টিনা যেন সেদিন ফুটবলকে নয়, বিদায় জানাচ্ছিল একটি যুগকে।

বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ আন্তর্জাতিক উপস্থিতি। ৩৯ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি বিদায়ী ম্যাচেও দেখিয়েছেন কেন তার নামটি ফুটবল ইতিহাসে আলাদা করে লেখা থাকবে। আর্জেন্টিনা জিতেছে ৩-০ গোলে। আর তিনটি গোলেই কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে ছিলেন মেসি।

প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর ৪৮তম মিনিটে মেসির কর্নার থেকে নিকোলাস ওতামেন্দি গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন। ৬১তম মিনিটে নিকো পাজের গোলে আবারও অবদান রাখেন মেসি। এরপর আসে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। ৭১তম মিনিটে পেনাল্টি। বল হাতে এগিয়ে গেলেন মেসি। মনুমেন্টালের হাজারো চোখ তখন তার দিকে। শট নিলেন। গোল।

এটি ছিল তার ১২৬তম আন্তর্জাতিক গোল এবং আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৮তম ম্যাচে করা গোলটি। একই সঙ্গে তিনি বিদায়ী ম্যাচ শেষ করলেন এক গোল ও দুই অ্যাসিস্ট নিয়ে। শেষ ম্যাচেও যেন মেসি নিজের গল্পের শেষ লাইনটিও নিজেই লিখলেন।
কিন্তু স্কোরলাইনই ছিল না আসল গল্প ৩-০ জয়—সংখ্যার হিসেবে এটিই ম্যাচের ফল। কিন্তু সেদিন মনুমেন্টালে ফুটবল ছিল কেবল উপলক্ষ। আসল গল্প ছিল একজন মানুষের সঙ্গে একটি জাতির সম্পর্ক।

ম্যাচ শুরুর আগেই আবেগে ভেসেছিলেন মেসি। মাঠে নামার আগে তার তিন সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে প্রবেশ করেন তিনি। গ্যালারিতে ছিলেন স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও মা সেলিয়া কুচ্চিত্তিনি। ম্যাচ শুরুর আগে মাঠে মেলে ধরা হয়েছিল বিশাল আর্জেন্টিনা জার্সি, যার ১০ নম্বরের ওপরে লেখা ছিল ‘গ্রাসিয়াস’।

এরপর ম্যাচের ১০ মিনিট পেরোতেই থেমে যায় খেলা। মেসির ১০ নম্বরকে সম্মান জানাতে দাঁড়িয়ে পড়ে গোটা স্টেডিয়াম। প্রায় ৮৫ হাজার মানুষ একসঙ্গে করতালি দিচ্ছেন। এ যেন কোনো ম্যাচের বিরতি নয়—এ যেন একটি যুগকে সম্মান জানানোর মুহূর্ত।

শেষ বাঁশি বাজার পরও মনুমেন্টাল খালি হয়নি। বরং তখনই শুরু হলো বিদায়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান অধ্যায়। আকাশে উড়ল শত শত ড্রোন। আলো আর নকশায় বদলে যেতে থাকল রাতের আকাশ। সঙ্গে ছিল আতশবাজি, আলোকসজ্জা ও বিশেষ সংগীত পরিবেশনা। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও জানিয়েছে, ম্যাচের পরের এই আয়োজনে ড্রোন, আলো, আতশবাজি ও বিভিন্ন শিল্পীর পরিবেশনা ছিল।

মেসির জন্য সাজানো সেই আকাশে ফুটে উঠল তার ১০ নম্বরের প্রতীকী উপস্থিতি, আর ফিরে এল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গৌরবময় স্মৃতিগুলোর একটি—বিশ্বকাপ। ২০২২। দোহা। বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে মেসি। একটি ছবিই যেন বলে দিচ্ছিল তার আর্জেন্টিনা-যাত্রার পুরো গল্প।

যে ট্রফির জন্য তাকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল, যে ব্যর্থতার পর তাকে শুনতে হয়েছিল কঠিন সমালোচনা, সেই বিশ্বকাপই শেষ পর্যন্ত তার হাতে উঠেছিল। আর সেই সাফল্য এসেছিল দীর্ঘ আন্তর্জাতিক পথচলার পর—২০২১ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফিনালিসিমা এবং ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে।

মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায় অবশ্য এমন ছিল না সবসময়। ছিল কোপা আমেরিকার ফাইনালে হার। ছিল বিশ্বকাপের ফাইনালে পরাজয়। ছিল সমালোচনা। ছিল হতাশা। এমনকি একসময় জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর কথাও বলেছিলেন মেসি।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিই হয়ে উঠলেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সাফল্যের অন্যতম প্রধান নায়ক। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে শুরু হয় অপেক্ষার অবসান। এরপর ফিনালিসিমা, তারপর ২০২২ সালের বিশ্বকাপ। একসময় যে জার্সিটি মেসির জন্য ছিল ব্যর্থতার প্রতীক, সেই জার্সিই শেষ পর্যন্ত তাঁকে এনে দিল অমরত্ব। 


শেষ বাঁশির পর সতীর্থরা ঘিরে ধরলেন মেসিকে। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রাও তাকে শুভেচ্ছা জানালেন। রেফারিও এগিয়ে এলেন। আর মেসি? তার চোখেও তখন জল। 

এই দৃশ্যটি হয়তো তার পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উপযুক্ত প্রতিচ্ছবি। কারণ এই পথটা কখনোই সহজ ছিল না। 

২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেকের পর ২১ বছর ধরে তিনি বহন করেছেন একটি দেশের প্রত্যাশা। কখনো সেই প্রত্যাশার ভার তাকে কাঁদিয়েছে, আবার কখনো তিনিই কোটি মানুষকে কাঁদিয়েছেন আনন্দে। শেষ পর্যন্ত তার নামের পাশে লেখা হলো— ২০৮ ম্যাচ। ১২৬ গোল। আর এক দীর্ঘ, অবিশ্বাস্য ২১ বছরের গল্প। 

রোসারিওর যে ছেলেটি একদিন ফুটবলকে নিজের জীবন বানিয়েছিল, সে একসময় হয়ে উঠল আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর। ক্লাব ফুটবলে প্রায় সবকিছু জেতার পরও জাতীয় দলের হয়ে সাফল্য পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে বহু বছর। সেই অপেক্ষা শেষ হয়েছে।

কিন্তু মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো সংখ্যা নয়। তিনি একটি প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। শিখিয়েছেন—হারের পরও ফিরে আসা যায়। সমালোচনার পরও দাঁড়িয়ে থাকা যায়। আর কখনো কখনো দীর্ঘ অপেক্ষার পর সবচেয়ে সুন্দর গল্পটিও লেখা যায়। 

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ। কিন্তু তাঁর গল্প শেষ নয়। কারণ কিছু খেলোয়াড় অবসর নেন, আর কিছু খেলোয়াড় ইতিহাস হয়ে যান। মেসি দ্বিতীয় দলের।

মনুমেন্টালের সেই রাত তাই শুধু একজন ফুটবলারের শেষ ম্যাচের রাত ছিল না। এটি ছিল একটি জাতির পক্ষ থেকে তার সবচেয়ে প্রিয় ফুটবল-নায়ককে শেষবারের মতো আলিঙ্গন করার রাত। 

মাঠে শেষবারের মতো আকাশী-সাদা জার্সি। গ্যালারিতে ৮৫ হাজার কণ্ঠ। চোখে জল। আকাশে আলো। আর সেই আলোর ভেতর একটি বার্তা— ‘Gracias, Leo’ ধন্যবাদ, লিও। ধন্যবাদ গোলের জন্য। ধন্যবাদ ট্রফির জন্য। ধন্যবাদ বিশ্বকাপের জন্য। তবে তার চেয়েও বেশি— স্বপ্নটাকে সত্যি করে দেখানোর জন্য।

সেদিন মনুমেন্টালে আর্জেন্টিনা শুধু তার ১০ নম্বর জার্সিধারীকে বিদায় জানায়নি। তারা বিদায় জানিয়েছে একটি যুগকে। লিওনেল মেসির যুগকে।