৬০ ঘণ্টায়ও নেভেনি আগুন, ভিড় ঠেকাতে দিনেরাতে পাহারায় পুলিশ
কক্সবাজার প্রতিনিধি
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ স্থাপনের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে লাগা আগুন ৬০ ঘণ্টা পার হলেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে আগুনের সূত্রপাতের পর থেকে অনবরত জ্বলছে আগুন। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগুনের উৎসস্থলের চারপাশে ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণ করছে উপজেলা প্রশাসন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করতে টাঙানো হয়েছে লাল পতাকা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিন-রাত পুলিশ ও গ্রাম পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে ঘটনাস্থল থেকে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)। নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে গ্যাসের প্রকৃতি, উপাদান ও সম্ভাব্য মজুত সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ছোটখাল সেতুসংলগ্ন আগুনের উৎসস্থল ঘিরে নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণের কাজ চলে। এ সময় প্রতিনিধিদলও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
### ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, এ ঘটনায় উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি উখিয়াবাসীর জন্য সুখবর।
উখিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু আব্দুল্লাহ বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে লাল পতাকা টাঙানো হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য দিন-রাত পুলিশ ও গ্রাম পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।
তবে আগুনের উৎসস্থল ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হলেও ঘটনাস্থলে মানুষের ভিড় বাড়ছে। উখিয়া-টেকনাফসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য নারী-পুরুষ আগুন দেখতে আসছেন। এতে নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রামুর খুনিয়াপালং থেকে আগুন দেখতে আসা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ফেসবুকে আগুনের ভিডিও দেখে দেখতে এসেছি।’ হলদিয়াপালং ইউনিয়নের ছাত্রনেতা মোরশেদ ফারাবী দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি জানিয়েছেন।
যেভাবে আগুনের সূত্রপাত
স্থানীয় ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে ইনানীর ছোটখাল সেতুসংলগ্ন এলাকায় মোহাম্মদ আবদুল্লাহর বসতভিটায় গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছিল। এ সময় ভূগর্ভ থেকে তীব্র বেগে গ্যাস বের হতে শুরু করে। পরে সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট, পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। কিন্তু অবিরাম গ্যাস নির্গত হওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বলতে থাকায় আশপাশের এলাকায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আগুনের শিখা ছড়িয়ে পড়া এবং গ্যাসের চাপে নতুন কোনো ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে উৎসস্থলের চারপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণ করছে প্রশাসন।
গ্যাসের উৎস নিয়ে যা বলছে বাপেক্স
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নলকূপ খননের সময় প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানো হয়েছিল। ভূগর্ভের ফাটল দিয়ে সেখান থেকে গ্যাস ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে।
তিনি বলেন, পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ ছাড়া গ্যাসের প্রকৃতি, উপাদান ও মজুত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। গ্যাসের নির্গমন বা চাপ জোর করে বন্ধ করার চেষ্টা করলে ভূগর্ভের অন্য কোনো দুর্বল স্থান দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই আপাতত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাপেক্সের সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষার ফল পাওয়া গেলে গ্যাসের ধরন ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তবে পরীক্ষার ফল ও পরবর্তী কারিগরি মূল্যায়ন ছাড়া আগুন কখন নিয়ন্ত্রণে আসবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
৩৬ ঘণ্টা বন্ধ ছিল বিদ্যুৎ
আগুনের শিখা বৈদ্যুতিক তারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছিল। এতে প্রায় চার হাজার পরিবার বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ৩৬ ঘণ্টা পর বুধবার গভীর রাতে ওই এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়।
উখিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) প্রকৌশলী কাইজার নুর বলেন, আগুনের শিখা বৈদ্যুতিক তারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় বুধবার রাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালু করা হয়েছে।
কৌতূহলী মানুষের ভিড়, দ্রুত সমাধানের দাবি
আগুনের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাস্থল দেখতে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। উখিয়া ও টেকনাফের পাশাপাশি রামুসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ সেখানে আসছেন। তবে আগুনের উৎসস্থলের কাছাকাছি ভিড় করলে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুত গ্যাসের উৎস ও বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করে নিরাপদ উপায়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং আশপাশের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
আগুনের প্রকৃত উৎস, গ্যাসের ধরন এবং তা নিয়ন্ত্রণের উপযুক্ত পদ্ধতি নির্ধারণে এখন বাপেক্সের পরীক্ষার ফল ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের কারিগরি মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কক্সবাজার সব খবর















