বিশ্বকাপের অর্থনীতি; আমরা কি পেলাম
অনুপম শীল
শেষ হলো ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ – ফুটবল বিশ্বকাপ। দুনিয়াজুড়ে এই বিশ্বকাপ একক কোনো আয়োজন হিশেবে সবচেয়ে বেশি প্রভাব তৈরি করে চলেছে গেল অন্তত ছয় দশক ধরে। পৃথিবীর কোণে কোণে ফুটবল ভক্তরা এক অনন্য আগ্রহ নিয়ে এই আয়োজন উপভোগ করেছে। স্থান-কালের বাধা ডিঙ্গিয়ে প্রিয় দল কিংবা প্রিয় ফুটবলারের সাথে হেসেছে; আবার কেঁদেছেও।
এবারের বিশ্বকাপে অনেক কিছুই প্রথম ঘটেছে। তিনটি দেশে আয়োজিত এই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো সর্বাধিক ৪৮ দল অংশগ্রহন করেছে। ভবিষ্যতে ফিফা এই দল সংখ্যাকে ৬৪তে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। এই প্রক্রিয়ায় ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপকে আরও বেশি মানুষের ভেতর নিয়ে যাওয়ার কথা বলেই জানাচ্ছে। তবে এর ভেতরেই আছে এক বিশাল বাণিজ্যিক কাঠামো ও আগ্রহ। কারণ ফুটবল বিশ্বকাপ এখন শুধু বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসরই নয়, এটি এখন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অবদান রাখা অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম। দল ও ম্যাচ বৃদ্ধির এই ধারণার ভেতরেও আছে নানামুখী ব্যবসায়িক আকাঙ্খা। সহজ ভাবে বলা যায়- ফুটবল বিশ্বকাপ এখন শুধু ফুটবলের উৎসব নয়, বরং বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দুও।
ভারতের ইকোনমিক টাইমস পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের বিশ্বকাপে চার বছরের অর্থনৈতিক চক্র (২০২৩-২০২৬) থেকে ফিফা আয় করেছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা গতবারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। গতবার আয় হয়েছিল ৭.৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পৃথিবীর অন্যান্য স্পোর্টস ইভেন্টের আয়ের দিকে তাকালে এই আয় সর্ম্পকে আরেকটু ধারণা পাওয়া যেতে পারে। যেমন- অলিম্পিক কমিটি সর্বশেষ অর্থনৈতিক চক্রে আয় করেছে ৭-৮ বিলিয়ন, উয়েফা এক মৌসুমে আয় করে ৬-৭ বিলিয়ন এবং ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের আইপিএলে এক মৌসুমে আয় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো। ফিফার আয়ের এই উচ্চলম্ফ মূলত এসেছে সম্প্রচার, স্পন্সরশিপ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম বৃদ্ধির মাধ্যমে।
বিশ্বকাপের ফিফার সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস হলো সম্প্রচারস্বত্ব। বিশ্বের শতাধিক দেশের টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো ম্যাচ সম্প্রচারের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করে। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক স্পন্সরশিপ, টিকিট বিক্রি, ভিআইপি হসপিটালিটি প্যাকেজ এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত পণ্য বিক্রিও আয়ের বড় উৎস। ফিফার বর্তমান বাণিজ্যিক চক্রে এসব খাত থেকে মোট আয় ১১ থেকে ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে সম্প্রচারস্বত্ব, স্পন্সরশিপ এবং টিকিট বিক্রিই সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে। এবারের বিশ্বকাপে ম্যাচে স্টেডিয়ামে সর্বনিম্ন অফিসিয়াল টিকিট মূল্য ছিল ৬০ মার্কিন ডলার। তবে এটি সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল না। এই টিকিট শুধুমাত্র ফাইনালে ওঠা বা বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনের মাধ্যমে যোগ্য সমর্থকদের জন্য বরাদ্দ ছিল। সাধারণ দর্শক সরাসরি এটি কিনতে পারেননি। অন্যদিকে, সাধারণ দর্শকদের জন্য ফিফার শেষ দফার বিক্রিতে ফাইনালের সর্বনিম্ন টিকিট (ক্যাটাগরি–৩) ছিল ৫,৭৮৫ মার্কিন ডলার। ডায়নামিক প্রাইসিংয়ের কারণে উচ্চতর ক্যাটাগরির টিকিটের দাম বেড়ে সর্বোচ্চ প্রায় ১১ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়। চাইলে টাকার অংকে একটু হিসেব করে নিতে পারেন…!
এর বাইরে ফিফা বিভিন্ন স্পন্সর প্রতিষ্ঠান থেকে ২.৪-২.৮ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। যদিও এসব স্পন্সর প্রতিষ্ঠান বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে খরচ করেছে ৮ বিলিয়ন ডলারের মতো। অর্থাৎ ফুটবল বিশ্বকাপে স্পন্সর হতে কোম্পানীগুলোর যত খরচ হয়েছে, তারচেয়ে চারগুণ বেশি খরচ হয়েছে স্পন্সরশিপের গল্প বিশ্বব্যাপী প্রচার করতে।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে আয়োজক শহরগুলো। লাখ লাখ দেশি-বিদেশি দর্শকের আগমনে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, খুচরা ব্যবসা এবং পর্যটন খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপ ঘিরে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
ব্যাংক অফ আমেরিকার প্রধান নির্বাহী ব্রায়ান ময়নিহান সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ মার্কিন অর্থনীতিতে সামগ্রিকভাবে ২০ বিলিয়ন ডলারের প্রবাহ তৈরি করেছে। ব্যাংকটি ৭ কোটি গ্রাহক যেখানে প্রতিমাসে গড়ে ৪শ বিলিয়ন ডলারের মতো খরচ করে, বিশ্বকাপ ঘিরে তা আরও ৫-৬ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ এই আয়োজনের প্রভাব শুধু খেলার মাঠ বা স্টেডিয়াম এলাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
ডিজিটাল স্ট্রিমিং, স্পোর্টস ডেটা অ্যানালিটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ম্যাচ বিশ্লেষণ, ক্যাশলেস পেমেন্ট, স্মার্ট টিকিটিং ইত্যাদি প্রযুক্তি নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কনটেন্ট নির্মাণ, ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং এবং ই-কমার্সের মাধ্যমে জার্সি ও অন্যান্য পণ্য বিক্রিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থাৎ কেবল মাঠের খেলা নয়, বরং ডিজিটাল অর্থনীতিরও একটি বড় চালিকাশক্তি হয়ে দেখা দিয়েছে এবারের বিশ্বকাপ। এখানে কার কতো আয় হলো, সেই হিসাব কারো কাছেই হয়তো নাই। বড় ধরনের বাণিজ্যিক প্রেক্ষাপটে চিন্তা করলে বিভিন্ন এয়ারলাইনসগুলো আয় করেছে ৯৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বৃহৎ আয়ের বিশ্বকাপে ব্যয়ও কম নয়। আয়োজক অঞ্চলে স্টেডিয়াম উন্নয়ন, নিরাপত্তা, পরিবহন ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, স্বেচ্ছাসেবক ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে বিপুল বিনিয়োগ করতে হয়। তবে এইখাতে এবারের ব্যয় তুলনামূলক কম ছিল। কারণ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর অধিকাংশ স্টেডিয়াম এবং পরিবহন অবকাঠামো আগেই প্রস্তুত ছিল। নতুন করে বিশাল সংখ্যক স্টেডিয়াম নির্মাণের প্রয়োজন হয়নি বলে অবকাঠামোগত ব্যয়ের চাপ পূর্ববর্তী অনেক বিশ্বকাপের তুলনায় কম ছিল।
বিশ্বকাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পুরস্কার অর্থ। ২০২৬ সালে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্য পুরস্কার ও বিভিন্ন সহায়তাসহ মোট প্রায় ৮৭১ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। চ্যাম্পিয়ন দল প্রাইজ মানি পেয়েছে ৫০ মিলিয়ন, রানার আপ ৩৩ মিলিয়ন এবং তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান অধিকারী পেয়েছে ২৯ ও ২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কোয়াটার ফাইনাল খেলা প্রত্যেক দল পেয়েছে ১৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া অংশগ্রহনকারী প্রত্যেক দলের পকেটে ঢুকছে ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার করে। এর বাইরে চলতি চক্রে ফিফার বিশ্বব্যাপী ফুটবল উন্নয়নে খরচ হচ্ছে ৫.১ বিলিয়ন এবং আয়োজন বাবদ খরচ ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা ২০২২ সালের তুলনায় অনেক বেশি। ছোট ও উন্নয়নশীল ফুটবল ফেডারেশনগুলোও আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ প্রমাণ করেছে আধুনিক ফুটবল এখন কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি, পর্যটন, বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যের এক বিশাল প্ল্যাটফর্ম। কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ব্যবসা এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের সুযোগ তৈরি করেও বিশ্বকাপ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গেলবার বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলোয়াড় এবং ফ্যানদের জন্য জার্সি রপ্তানি করে বড় অংকের টাকা রোজগার করলেও এবার দেশের সেইপথে আয় কমেছে। টাকা উড়ার এই বিশাল আয়োজন থেকে বাংলাদেশ কেন এতো অল্প আয় করলো, সেটি নিয়ে ভাবতে হবে। তবে তার আগে হয়ত ঠিক করতে হবে- এই ভাবনাগুলো ভাববে কে…?
অনুপম শীল
গণমাধ্যমকর্মী
কলম সব খবর















