বিশ্বকাপ জেতা হয়নি, জয় করেছেন কোটি হৃদয়
লিখেছেন : অনুপম শীল
ফুটবলের মাঠে ধ্রুপদী সুর তুলে কোটি মানুষের মনে স্থান পায় কয়জন? এই সংখ্যাটা হাতেগোনা। আর এর ভেতরে কেউ বিজয়ের জয়মাল্য পরে কাঁপিয়ে দেয় দুনিয়া। কেউ কেউ থাকে মানুষের হৃদয়ে এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে। নেইমার দা সিলভা সান্তোস জুনিয়র সেই দ্বিতীয় দলের মানুষ। ফুটবল মাঠের সবুজ প্রান্তরে তাঁর শেষ পদচিহ্ন মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো, যেন ব্রাজিলের কোনো অরণ্যে সন্ধ্যার চঞ্চল পাখিটি উড়ে গেল। বিদায়ী পথরেখা ধরে আলো রয়ে গেল, কিন্তু তার গান আর শোনা গেল না। যেন সাম্বার তালে নেচে ওঠা এক স্বপ্ন নীরব হয়ে গেল।
১৯৯২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। ব্রাজিলের সাও পাওলো অঙ্গরাজ্যের মোগি দাস ক্রুজেস শহরে জন্ম হয়েছিল নেইমার জুনিয়রের। কেউ জানত না, এই শিশুটির পায়ের সঙ্গে একদিন একটি দেশের স্বপ্ন জড়িয়ে যাবে। বাবা নেইমার সান্তোস সিনিয়র নিজেও ফুটবলার ছিলেন। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু স্বপ্নের দরজাও খোলা ছিল। সেই দরজা খুলে নেইমার জেনেছিল, মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ টাকা নয়, বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসই ছেলেটিকে বড় হতে শিখিয়েছিল। ছোট্ট পাড়া থেকে নিয়ে গিয়েছিল বিশ্বমঞ্চে।
আর সব ব্রাজিলিয়ান প্রতিভার মতোই নেইমারের শৈশবের মাঠ নিখুঁত সবুজ ঘাসে মোড়া ছিল না। ধুলোমাখা গলি, বালুময় উঠান, ফুটসালের ছোট ছোট কোর্টেই স্বপ্ন বুনেছিল। রুক্ষ আর কঠিন জায়গাগুলোই ছিল তার প্রথম পাঠশালা। ক্রমে বলটি ধীরে ধীরে খেলনার সীমা ছাড়িয়ে তার শরীরের ভাষা হয়ে উঠল। পায়ের প্রতিটি স্পর্শে যেন লুকিয়ে থাকত একেকটি গল্প। ড্রিবল করতে করতে সে শুধু প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলত না, দারিদ্র্যকেও একটু একটু করে অতিক্রম করত। আর প্রতিটি দৌড়ে মনে হতো, একটি ছেলে নিজের ভাগ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে।
পরে পৃথিবী তাকে তারকা বলেছে। কোটি কোটি মানুষ তাকে জাদুকর বলেছে। কিন্তু সব পরিচয়ের আড়ালে নেইমার যেন সেই ছেলেটিই থেকে গেছে, যে একটি বল বুকে জড়িয়ে বিশ্বাস করত—স্বপ্ন কখনও দূরের কোনো নক্ষত্র নয়; ইচ্ছে থাকলে তাকে পায়ের কাছেও নামিয়ে আনা যায়। মাত্র এগারো বছর বয়সে তার প্রতিভা ইউরোপের দৃষ্টি কাড়ে। রিয়াল মাদ্রিদ তাকে নিতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত সে থেকে যায় সান্তোসে। সেই সিদ্ধান্তই যেন তাকে ব্রাজিলীয় ফুটবলের ঐতিহ্যের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করল। কিংবদন্তি পেলের ক্লাব সান্তোসেই কৈশোরের নেইমার ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন জাতির নতুন আশা।
২০১৩ সালে বার্সেলোনায় যোগ দেওয়া ছিল তার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল বাঁক। লিওনেল মেসি, লুইস সুয়ারেজ ও নেইমার—এই ‘এমএসএন’ ত্রয়ী ফুটবলকে যেন ধ্রুপদী শিল্পে পরিণত করেছিল। ২০১৪–১৫ মৌসুমে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লা লিগা ও কোপা দেল রে—এক মৌসুমে তিনটি শিরোপা জিতে তারা ইতিহাস রচনা করে। বিশেষ করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নকআউট পর্বে নেইমারের গতি, ড্রিবলিং ও গোল করার ক্ষমতা তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়।
পরে প্যারিস সেন্ট জার্মেইনে তাঁর রেকর্ড গড়া স্থানান্তর বিশ্ব ফুটবলের অর্থনীতিকেও নতুন সংজ্ঞা দেয়। কিন্তু অর্থের অঙ্ক যত বড় হয়েছে, ততই যেন তাকে তাড়া করেছে চোট, অপূর্ণতা আর প্রত্যাশার ভার।
ব্রাজিল জাতীয় দলের জার্সিতে নেইমার ছিলেন এক দীর্ঘ যুগের প্রতীক। ২০১০ সালে অভিষেকের পর একে একে চারটি বিশ্বকাপ খেলেছেন তিনি। ২০১৩ সালে কনফেডারেশনস কাপ জয়ে ছিলেন অনন্য। ২০১৬ সালে রিও অলিম্পিকে ব্রাজিলকে এনে দেন বহু প্রতীক্ষিত অলিম্পিক স্বর্ণপদক। জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনও নিজের করে নেন তিনি। অথচ ফুটবল এমনই নিষ্ঠুর যে, খেলোয়াড় দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা, তার হাতেই বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি ধরা পড়ল না।
২০১৪ সালের বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার বিপক্ষে হুয়ান জুনিগার হাঁটুর আঘাতে ভেঙে যায় তাঁর মেরুদণ্ডের একটি কশেরুকা। সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ব্রাজিলের ৭–১ গোলের পরাজয় তিনি মাঠে থেকে দেখেননি, কিন্তু সেই ক্ষত সারাজীবন বহন করেছেন। ২০১৮ সালে সমালোচনা, ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হৃদয়ভাঙা বিদায়—প্রতিবারই মনে হয়েছে, ভাগ্য যেন তার সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্তগুলো চুরি করে নেয়।
অবশেষে ২০২৬ বিশ্বকাপ। বহু চোট কাটিয়ে শেষবারের মতো ফিরে এসেছিলেন। কোচ কার্লো আনচেলত্তি যেদিন দল ঘোষণা করছিলেন, সেদিন নেইমারের নাম শুনে উল্লাসে ফেটে পড়েছিল ভক্তরা। তবে এবারের বিশ্বকাপে কোচের গেম প্ল্যানে পুরোপুরি ছিলেন না। তাই সব ম্যাচ খেলতে পারেননি। নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের বিদায়ের পর চোখের জলেই শেষ হলো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। ম্যাচ শেষে নেইমারের কণ্ঠে, ‘আমি চেষ্টা করেছি... এখন সব শেষ।’ এই বাক্যের মধ্য দিয়েই অবসান ঘটে একটি যুগের। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের এক দুর্দান্ত শিল্পীর জাদুকরী ছন্দের।
নেইমারকে নিয়ে মূল্যায়নও একরৈখিক ছিল না। সময়ের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী এবং বন্ধু লিওনেল মেসির কাছে নেইমার সেরা খেলোয়াড়দের একজন। ব্রিটিশ সাংবাদিক জোনাথন উইলসন লিখেছিলেন, ‘নেইমারের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো তাঁর প্রতিভার উচ্চতা এত বেশি ছিল যে, অর্জনও অনেকের কাছে যথেষ্ট বলে মনে হয়নি।’ উল্টো পিঠে সমালোচনাও ছিল। বিবিসির বিশ্লেষণে ২০১৮ বিশ্বকাপের সময় বলা হয়েছিল, তাঁর অসাধারণ ফুটবলের পাশাপাশি অতিরঞ্জিত ও বারবার পড়ে যাওয়ার প্রবণতা অনেক নিরপেক্ষ দর্শকের বিরক্তির কারণ হয়েছিল। আবার ব্রাজিলের সংবাদপত্র গ্লোবো লিখেছিল, ‘নেইমার ব্রাজিলকে মুগ্ধ করেছেন, কিন্তু পৃথিবীর অনেককে বিরক্তও করেছেন।’
সম্ভবত এই দ্বৈততাই নেইমারের প্রকৃত পরিচয়। তিনি ছিলেন আলো, আবার সেই আলোর ছায়াও। তিনি ছিলেন প্রতিভার বিস্ময়, আবার অপূর্ণতারও প্রতীক। তাঁর ড্রিবলিং ছিল নদীর স্রোতের মতো, তাঁর পাস ছিল বনভূমির বাতাসের মতো। আর তাঁর চোখের জল ছিল এমন এক মানুষের, যে শেষ পর্যন্ত নিজের সমস্তটুকু দিয়েও সবচেয়ে বড় স্বপ্নটিকে ছুঁতে পারল না।
বিশ্বকাপ শেষ হবে, নতুন নায়ক জন্ম নেবে, নতুন প্রজন্ম নতুন গান গাইবে। কিন্তু যখনই হলুদ জার্সি পরে কোনো তরুণ ফুটবলার বল পায়ে তিনজনকে কাটিয়ে এগিয়ে যাবে, তখন কোথাও না কোথাও মনে পড়বে—একদিন এমনই একজন ছিল, যার নাম ছিল নেইমার। সে বিশ্বকাপ জিততে পারেনি, কিন্তু কোটি মানুষের হৃদয়ে ফুটবলের সৌন্দর্যকে নতুন করে জাগিয়ে দিয়েছিল।
বিদায়, ফুটবলের অতৃপ্ত রাজপুত্র…!
লেখক : অনুপম শীল, সিনিয়র রিপোর্টার, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি।
কলম সব খবর















