Cvoice24.com

আহা পরিবেশ দিবস!
গড়ে উঠছে সমতলের শহর: পাহাড় হত্যার দীর্ঘ উপাখ্যান

শুভ্রজিৎ বড়ুয়া
১৪:৫৯, ৫ জুন ২০২৬
গড়ে উঠছে সমতলের শহর: পাহাড় হত্যার দীর্ঘ উপাখ্যান

চট্টগ্রামের পরিচয় একসময় ছিল পাহাড়, সমুদ্র আর সবুজের নগরী হিসেবে। নগরীর প্রবেশমুখ বিশ্বকলোনি, ফিরোজশাহ কলোনি, ফয়'স লেক, আকবর শাহ, টাইগারপাস থেকে শুরু করে বাটালি হিল, মতিঝর্ণা, সিআরবি, কাজীর দেউড়ি কিংবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, সবখানেই ছিল পাহাড়ের স্বাভাবিক বিস্তার। কিন্তু সেই চট্টগ্রাম আজ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পাহাড় কেটে সমতল করা হচ্ছে, পাহাড়ের ঢালে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও আবাসন প্রকল্প। কোথাও চলছে প্লট বাণিজ্য, কোথাও পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি হচ্ছে নতুন বসতি। ফলে পাহাড়ঘেরা চট্টগ্রাম ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে একটি সমতল নগরীতে।

পাহাড় ধ্বংসের এই প্রবণতা শুধু পরিবেশবাদীদের উদ্বেগের কারণ নয়, এটি এখন সরকারি সংস্থা ও প্রশাসনেরও বড় মাথাব্যথা। পাহাড় রক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছে চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের তালিকাও দীর্ঘ হয়েছে। বর্তমানে অন্তত ২৬টি পাহাড়কে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর অধিকাংশই বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মালিকানাধীন। কিন্তু মালিকানা সরকারি হলেও পাহাড় রক্ষার বাস্তব চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, টাইগারপাস, সিআরবি, লালখানবাজার, মতিঝর্ণা, বাটালি হিল, আকবর শাহ, পরিবেশ অধিদপ্তরসংলগ্ন পাহাড়, লেক সিটি এলাকা, কৈবল্যধাম ও নাসিরাবাদ পাহাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ের প্রাকৃতিক অবয়ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কোথাও পাহাড়ের ঢাল কেটে সমান করা হয়েছে, কোথাও গড়ে উঠেছে আবাসন প্রকল্প। আবার অনেক এলাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের জন্য পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। পাহাড়ের জমি ঘিরে চলছে প্লট বাণিজ্যও। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ রয়েছে।

পরিবেশ সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড় ধ্বংসের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর মানবিক মূল্য। পাহাড় কেটে বসতি গড়ে তোলা এবং পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসের ফলে বারবার প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গত দেড় দশকে পাহাড় ধসে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ পাহাড় ধসে প্রাণ হারান ১২৯ জন। সেই ঘটনার ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই ২০০৮ সালে মতিঝর্ণায় পাহাড় ধসে মারা যান ১১ জন। ২০১১ সালে বাটালি হিলে প্রাণ হারান আরও ১১ জন। ২০১২ সালে পাহাড়ধস ও প্রতিরক্ষা দেয়াল ধসে মারা যান ১৭ জন। ২০১৭ সালের জুন মাসে দুই দফা পাহাড় ধসে নিহত হন ৩৭ জন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে ছোট-বড় দুর্ঘটনায় আরও বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। সব মিলিয়ে গত দেড় দশকে পাহাড়ধসে মৃত্যুর সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়েছে।

২০০৭ সালের ভয়াবহ ট্র্যাজেডির পর পাহাড় রক্ষায় নানা উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল। সরকার গঠন করে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। বিশেষজ্ঞদের সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি করা হয় ৩৬ দফা কর্মপরিকল্পনা। এসব সুপারিশে পাহাড় কাটা বন্ধ, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ এবং পাহাড় সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরে পরিবেশবাদী সংগঠন বেলার দায়ের করা মামলায় ২০১২ সালের ১৯ মার্চ হাইকোর্ট পাহাড় কর্তনকারীদের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইনে ব্যবস্থা নেওয়া এবং পাহাড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেন।

কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সুপারিশ ও নির্দেশনার বড় অংশই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রয়েছে। প্রতি বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসের আশঙ্কা সামনে এলে সভা-সেমিনার, সতর্কতা এবং উচ্ছেদ অভিযানের আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু মৌসুম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড় রক্ষার উদ্যোগও অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। ফলে নতুন করে দখল, বসতি নির্মাণ ও পাহাড় কাটার সুযোগ তৈরি হয়।

পাহাড় রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তরও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত এক যুগে পাহাড় কাটা রোধে ৫৬০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে প্রায় ৮৫ কোটি ২ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। ২০২২ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত দায়ের করা হয়েছে ৩৭টি মামলা। তবে প্রশ্ন উঠেছে, শত শত অভিযান, কোটি কোটি টাকার জরিমানা এবং একের পর এক মামলা হওয়ার পরও কেন পাহাড় কাটা বন্ধ হচ্ছে না।

পরিবেশবাদীদের ভাষ্য, সমস্যার মূল জায়গাটি আইন প্রয়োগে নয়, বরং প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে। পাহাড় ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে না। ফলে পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত শ্রমিক বা ছোটোখাটো ব্যক্তিরা শাস্তি পেলেও নেপথ্যের কুশীলবরা থেকে যায় আড়ালে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড় কেবল মাটির উঁচু স্তূপ নয়; এটি একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা বলয়। পাহাড় বৃষ্টির পানি ধারণ করে, ভূমিধস প্রতিরোধে সহায়তা করে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে এবং নগরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাহাড় ধ্বংসের ফলে শুধু পরিবেশের ক্ষতি হয় না, বাড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোর দিকে তাকালে তাই একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে। এত কমিটি, এত সুপারিশ, এত অভিযান এবং এত প্রাণহানির পরও কেন থামছে না পাহাড় হত্যা? পাহাড় রক্ষার দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদের অধিকাংশই সরকারি সংস্থা। তবু একের পর এক পাহাড় হারিয়ে যাচ্ছে। যদি এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে পাহাড়ের নগরী চট্টগ্রাম হয়তো শুধু ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে।