প্রতিভা আছে, মাঠ নেই
চট্টগ্রাম বিকেএসপির ভবিষ্যৎ কোথায়?
সুমন গোস্বামী
বাংলাদেশে বিশ্বমানের ক্রীড়াবিদ তৈরির কথা উঠলেই যে প্রতিষ্ঠানটির নাম সবার আগে আসে, সেটি বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—বিকেএসপি। দেশের অসংখ্য প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ এই প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দেশের পতাকা তুলে ধরেছেন বিশ্বমঞ্চে।
কিন্তু সেই বিকেএসপিরই একটি আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র যখন পর্যাপ্ত মাঠ, ইনডোর সুবিধা, প্রশিক্ষণ অবকাঠামো কিংবা দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক ব্যবস্থার অভাবে ধুঁকতে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—আমরা আসলে ক্রীড়া প্রতিভা বিকাশে কতটা আন্তরিক?
প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন সেই কেন্দ্রটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরী চট্টগ্রামে অবস্থিত।
চট্টগ্রামকে বলা হয় বন্দরনগরী। দেশের অর্থনীতি, শিল্প, সংস্কৃতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে এই শহরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রাজধানী ঢাকার পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী হিসেবে চট্টগ্রামের ক্রীড়াক্ষেত্রেও বড় সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর অন্যতম প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বিকেএসপি যেন নিজেই সুযোগ-সুবিধার সংকটে আটকে আছে।
নগরের পাহাড়তলী সাগরিকা রোডে বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ক্রিকেট স্টেডিয়াম ও মহিলা কমপ্লেক্স স্টেডিয়ামের পাশে মাত্র তিন একর জায়গার ওপর পরিচালিত হচ্ছে চট্টগ্রাম বিকেএসপির আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
একদিকে পাশের স্টেডিয়ামে নিয়মিত ক্রীড়াযজ্ঞ চলছে, অন্যদিকে মাত্র কয়েক গজ দূরেই বিকেএসপির প্রশিক্ষণার্থীদের জায়গার সংকটে প্রশিক্ষণ নিতে হচ্ছে—বিষয়টি নিঃসন্দেহে দুঃখজনক।
একটি ক্রীড়া প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মূল শক্তিই যেখানে মাঠ, সেখানে পূর্ণাঙ্গ ক্রিকেট বা ফুটবল মাঠই যদি না থাকে, তাহলে সেখানে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরির স্বপ্ন কতটা বাস্তবসম্মত?
চট্টগ্রাম বিকেএসপির উপপরিচালক মো. মতিউর রহমানের বক্তব্য থেকেই সমস্যার গভীরতা বোঝা যায়। মাত্র তিন একর জায়গার কারণে ক্রিকেট কিংবা ফুটবলের পূর্ণাঙ্গ মাঠ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। একটি ইনডোর সুবিধা জিমনেশিয়ামের মধ্যেই তৈরি করে নিতে হয়েছে। নেট বসানোসহ অনেক কিছুই করতে হয়েছে নিজেদের উদ্যোগে।
অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি চলছে—কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে নয়, বরং সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করে।
অবাক করার মতো বিষয় হলো, এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চট্টগ্রাম বিকেএসপি সাফল্য এনে দিয়েছে। অনূর্ধ্ব-১৪ ক্রিকেট দল জাতীয় পর্যায়ে শিরোপা জিতেছে। একবার নয়, টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্বও রয়েছে তাদের।
২০১৬ সালে প্রায় সাতজন প্রশিক্ষণার্থী অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছেন। ২০১৮ সালে অনূর্ধ্ব-১৪ জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছেন নয়জন। আর ২০১৯ সালে একসঙ্গে ১২ জন ক্রিকেট প্রশিক্ষণার্থী অনূর্ধ্ব-১৫ জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছেন।
এই পরিসংখ্যানই আসলে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসে। যেখানে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই এত প্রতিভা উঠে আসছে, সেখানে পর্যাপ্ত সুযোগ পেলে এই কেন্দ্রটি কতজন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি করতে পারত?
আমরা কি কখনো সেই সম্ভাবনাটি হিসাব করে দেখেছি? ২০১৭ সালে ক্রিকেট দিয়ে নতুন করে কার্যক্রম শুরু করার পর ২০১৯ সালে যুক্ত হয় বাস্কেটবল। চলতি বছরে যুক্ত হয়েছে কাবাডি ও বক্সিং।
শুনতে ভালো লাগে—একটি কেন্দ্রের ডিসিপ্লিন বাড়ছে। কিন্তু ডিসিপ্লিন বাড়ানোর সঙ্গে যদি অবকাঠামো না বাড়ে, তাহলে সেটি কি সত্যিকারের সম্প্রসারণ?
বক্সিংয়ের জন্য ইনডোর সুবিধা রয়েছে। কাবাডি হচ্ছে আউটফিল্ডে, কিন্তু নেই প্রয়োজনীয় ম্যাটও। বাস্কেটবলের প্রশিক্ষণ চলছে, কিন্তু জায়গা আরও বাড়ানো দরকার। অর্থাৎ একদিকে নতুন নতুন খেলাকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক অবকাঠামো নিশ্চিত করা হচ্ছে না। এভাবে কি বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করা সম্ভব?
শুধু মাঠের সংকট নয়, চট্টগ্রাম বিকেএসপির আরেকটি বড় সমস্যা একাডেমিক শিক্ষা। এখানে প্রশিক্ষণার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে মাত্র অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। এরপর তাদের বিকেএসপি ছাড়তে হয়।
একজন কিশোর বা কিশোরী যখন একটি নির্দিষ্ট বয়সে নিয়মিত ক্রীড়া প্রশিক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছায়, ঠিক তখনই তাকে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে হচ্ছে। ফলে খেলাধুলা ও একাডেমিক শিক্ষার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ে।
একজন সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়কে তৈরি করতে শুধু কয়েক বছর প্রশিক্ষণ দিলেই হয় না। তার শিক্ষা, মানসিক বিকাশ, শারীরিক সক্ষমতা, পুষ্টি, চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ—সবকিছুর সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক ও বিসিবির টুর্নামেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর চট্টগ্রাম বিকেএসপির অবকাঠামো নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছেন, সেটি গুরুত্ব দিয়ে ভাবার সময় এসেছে। তার বক্তব্যের মূল কথা—মাঠ ছাড়া একটি ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কীভাবে প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করবে?
প্রশ্নটি কঠিন, কিন্তু অযৌক্তিক নয়। একটি পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি পর্যাপ্ত মাঠই না থাকে, তাহলে সেখানে প্রশিক্ষণার্থীরা কীভাবে নিয়মিত অনুশীলন করবে? ক্রিকেট, ফুটবল কিংবা অন্যান্য আউটডোর ডিসিপ্লিনে কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক মান অর্জন করবে? শুধু একটি ভবন, কয়েকটি কক্ষ বা প্রশিক্ষণের নাম থাকলেই তো একটি বিকেএসপি পূর্ণাঙ্গ হয় না।
চট্টগ্রামে বিকেএসপির এই কেন্দ্রটি শুধু একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই কেন্দ্রটি যদি কোনো কারণে সংকুচিত হয় বা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ক্ষতিটা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের হবে না। ক্ষতি হবে চট্টগ্রাম ও আশপাশের অঞ্চলের অসংখ্য সম্ভাবনাময় তরুণের। তাই প্রয়োজন কেন্দ্রটি সরিয়ে নেওয়া নয়, বরং এর পরিসর বাড়ানো।
চট্টগ্রাম বিকেএসপির উপপরিচালক মো. মতিউর রহমান জানিয়েছেন, আশপাশের জমি থেকে আরও প্রায় ১০ একর জায়গা পাওয়া গেলে দুটি ক্রিকেট মাঠ, একটি ফুটবল টার্ফ, একটি ইনডোর এবং উন্নত জিমনেশিয়াম তৈরি করা সম্ভব। এটি নিঃসন্দেহে একটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব। এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ।
একটি বিভাগীয় শহরে বিশ্বমানের ক্রীড়াবিদ তৈরির প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে যদি অতিরিক্ত কিছু জমির প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটিকে ব্যয় হিসেবে না দেখে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত। একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার, ফুটবলার, বক্সার কিংবা কাবাডি খেলোয়াড় শুধু একজন ব্যক্তি নন—তিনি দেশের সম্পদ।
আজ একটি মাঠ তৈরি করতে যে অর্থ ব্যয় হবে, আগামী দিনে সেই মাঠ থেকেই হয়তো উঠে আসবে এমন একজন খেলোয়াড়, যিনি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম তুলে ধরবেন। তাহলে প্রশ্ন হলো—আমরা কি আজকের অবকাঠামোগত ব্যয়কে গুরুত্ব দেব, নাকি আগামী দিনের সম্ভাবনাকে হারাব?
ভালো কোচও প্রয়োজন। অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষ প্রশিক্ষক ও কোচ। একজন ভালো খেলোয়াড় তৈরির জন্য শুধু মাঠ থাকলেই হবে না। প্রয়োজন আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, স্পোর্টস সায়েন্স, ফিটনেস, পুষ্টি, মনোবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক মানের কোচিং।
সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীরের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রয়োজনে বিদেশি কোচও আনা যেতে পারে। বিষয়টি বিবেচনা করার মতো। কারণ আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকেও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে।
প্রদীপের নিচে অন্ধকার কেন? চট্টগ্রাম বিকেএসপির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। একদিকে এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক কেন্দ্র, যার মূল লক্ষ্যই বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করা। অন্যদিকে সেই কেন্দ্রেরই পর্যাপ্ত মাঠ নেই, পূর্ণাঙ্গ ইনডোর নেই, কাবাডির প্রয়োজনীয় ম্যাট নেই, বাস্কেটবলের জায়গা সংকুচিত এবং অষ্টম শ্রেণির পর একাডেমিক শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তারপরও সেখান থেকে জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় উঠে আসছে। তাহলে বলা যায়, সমস্যাটি প্রতিভার নয়। সমস্যাটি সুযোগের। চট্টগ্রামের তরুণদের প্রতিভা আছে, আগ্রহ আছে, সাফল্যের প্রমাণও আছে—শুধু তাদের প্রয়োজন পর্যাপ্ত সুযোগ।
চট্টগ্রাম বিকেএসপিকে আর ‘নামকাওয়াস্তে’ একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে রেখে দেওয়ার সময় নেই। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রথমত, পর্যাপ্ত জমি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্রিকেট ও ফুটবলের পূর্ণাঙ্গ মাঠ তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, আধুনিক ইনডোর ও জিমনেশিয়াম নির্মাণ করতে হবে। চতুর্থত, প্রতিটি ডিসিপ্লিনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, অষ্টম শ্রেণির পরও প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ষষ্ঠত, দেশি-বিদেশি দক্ষ কোচ ও আধুনিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়। এগুলো একটি ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মৌলিক প্রয়োজন। চট্টগ্রাম বিকেএসপির গল্প তাই শুধু সীমাবদ্ধতার গল্প নয়। এটি সম্ভাবনারও গল্প। মাত্র তিন একর জায়গা, সীমিত অবকাঠামো আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও যখন জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, তখন পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পেলে এই কেন্দ্র কতদূর যেতে পারে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
চট্টগ্রাম বিকেএসপির সামনে এখন দুটি পথ—সীমাবদ্ধতার মধ্যে কোনোভাবে টিকে থাকা, অথবা পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে সত্যিকারের আঞ্চলিক ক্রীড়া উৎকর্ষকেন্দ্রে পরিণত হওয়া।
সিদ্ধান্তটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তবে একটি কথা মনে রাখা দরকার—প্রতিভা একবার হারিয়ে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনা যায় না। কিন্তু সময়মতো সুযোগ দিলে সেই প্রতিভাই একদিন বাংলাদেশের পতাকা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে পারে।
লেখক: সুমন গোস্বামী, সংবাদকর্মী
কলম সব খবর















