Cvoice24.com

গ্যাস সংকটের অজুহাতে চট্টগ্রামে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি—নির্দেশ দিল কে?

প্রশান্ত বড়ুয়া
১৪:০৮, ২২ আগস্ট ২০২৬
গ্যাস সংকটের অজুহাতে চট্টগ্রামে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি—নির্দেশ দিল কে?

চট্টগ্রাম মহানগরের গ্যাসচালিত বাস, মিনিবাস ও সবুজ টেম্পোর ভাড়া হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কয়েক দিন আগেও এসব যানবাহনে যাতায়াতের ন্যূনতম ভাড়া ছিল ৫ টাকা। বর্তমানে অনেক গাড়িতে যাত্রীদের কাছ থেকে ১০ টাকা করে এবং নির্দিষ্ট দূরত্বের পর অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। চালকদের পক্ষ থেকে এ ভাড়া বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে গ্যাস সংকটকে।

মহানগরের নতুন ব্রিজ ও ফতেয়াবাস থেকে ছেড়ে যাওয়া ৪ নম্বর মিনিবাস, কালুরঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া ১০ নম্বর রুটের বাস-মিনিবাসের পাশাপাশি নগরের কাপ্তাই রাস্তার মাথা, অক্সিজেন মোড় ও চকবাজার থেকে চলাচলকারী সবুজ টেম্পোগুলোতেও ন্যূনতম ১০ টাকা করে ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি কয়েকটি গাড়ির চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১০ নম্বর রুটে চলাচলকারী অনেক বাসই গ্যাসচালিত। অথচ এসব বাসেও যাত্রীদের কাছ থেকে ১০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। একই রুটের একই নম্বরের মিনিবাসগুলোও একই হারে ভাড়া আদায় করছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—গ্যাসচালিত যানবাহনের ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে কোনো সরকারি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না?

যদি এমন কোনো সিদ্ধান্ত না থাকে, তাহলে নিজেদের ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়িয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তারা পাচ্ছেন কীভাবে? আর যদি ভাড়া বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের বিষয়টি যাত্রীদের স্পষ্টভাবে জানানো হচ্ছে না কেন?

বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে গ্যাসচালিত যানবাহনের জ্বালানি ব্যয়ের কথা বিবেচনা করলে। সাধারণভাবে গ্যাসচালিত বাস, মিনিবাস ও টেম্পোর পরিচালন ব্যয় তেলচালিত যানবাহনের তুলনায় কম। এই তুলনামূলক কম জ্বালানি ব্যয়ের সুবিধার কারণেই দীর্ঘদিন ধরে এসব যানবাহনের ভাড়াও তেলচালিত পরিবহনের তুলনায় কম রাখা হয়ে আসছে।

তাহলে গ্যাস সরবরাহে সাময়িক সংকট দেখা দিলেই সেই কম খরচের সুবিধার কথা ভুলে গিয়ে হঠাৎ করে ভাড়া দ্বিগুণ করা কতটা যৌক্তিক—এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া এভাবে ভাড়া বাড়ানো হলে তা সাধারণ যাত্রীদের জন্য বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া দিতে আপত্তি জানালেও অনেক চালক ও কর্মচারী তা আমলে নিচ্ছেন না। ফলে প্রতিদিনই বিভিন্ন গাড়িতে চালক, হেলপার ও যাত্রীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও ঝগড়ার ঘটনা ঘটছে। গণপরিবহনে যাতায়াত করতে গিয়ে একজন যাত্রীকে যেখানে নির্ধারিত ভাড়া দেওয়ার কথা, সেখানে তাকে প্রতিনিয়ত ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষি কিংবা তর্কে জড়াতে হচ্ছে। এটি কোনোভাবেই একটি সুশৃঙ্খল গণপরিবহন ব্যবস্থার চিত্র হতে পারে না।

গ্যাস সংকট বাস্তব হলে তার প্রভাব পরিবহন খাতে পড়তে পারে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সংকটের পুরো বোঝা সাধারণ যাত্রীর ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের মতো করে ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। বিশেষ করে গ্যাসচালিত যানবাহনের তুলনামূলক কম জ্বালানি ব্যয়ের সুবিধা যদি এতদিন যাত্রীদের জন্য কম ভাড়ার অন্যতম কারণ হয়ে থাকে, তাহলে সংকটের অজুহাতে সেই ভাড়া একলাফে বাড়ানোর আগে বিষয়টি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও যৌক্তিকতার আওতায় আসা উচিত।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই যদি গ্যাস সংকটকে কেন্দ্র করে কোনো কোনো পরিবহন মালিক বা চালক নিজেদের মতো করে ভাড়া বাড়িয়ে দেন, তাহলে এর সরাসরি চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। পাশাপাশি গণপরিবহনে এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত ভাড়া আদায় সরকারের ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ, চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন রুটে বর্তমানে কী হারে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে, তা জরুরি ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা হোক। গ্যাসচালিত ও তেলচালিত যানবাহনের প্রকৃত পরিচালন ব্যয়, জ্বালানি সংকটের বাস্তবতা এবং যাত্রীদের সামর্থ্য—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে ভাড়ার যৌক্তিকতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে কোন রুটে কত ভাড়া নির্ধারিত রয়েছে, তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া এবং প্রতিটি গণপরিবহনে ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা দরকার। নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত আদায় বন্ধে প্রয়োজনে নিয়মিত অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা যেতে পারে। যাত্রীদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থাও থাকা জরুরি।

গ্যাস সংকটের সমাধান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব; এর অজুহাতে যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো বাড়তি ভাড়া আদায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। চট্টগ্রাম মহানগরের গণপরিবহনে ভাড়া নিয়ে যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, প্রশাসন দ্রুত তা আমলে নিয়ে একটি স্পষ্ট ও কার্যকর ব্যবস্থা নেবে—এটাই নগরবাসীর প্রত্যাশা।

লেখক-প্রশান্ত বড়ুয়া

সাংবাদিক