কাপ্তাইয়ে মিলল শতবর্ষী মা গাছের সন্ধান
অর্ণব মল্লিক, কাপ্তাই (রাঙামাটি); সিভয়েস২৪
পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের কাপ্তাই রেঞ্জে অন্তত ১০০টির বেশি শতবর্ষী ‘মাদার ট্রি’র (মা গাছ) সন্ধান মিলেছে। সাম্প্রতিক জরিপে সীতাপাহাড় ও রাম পাহাড়সহ গহীন অরণ্যের বিভিন্ন স্থানে এসব প্রাচীন ও পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গাছ চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক স্বাধীন।
বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বনের সবচেয়ে পুরোনো, বড় এবং বিস্তৃত শাখা-প্রশাখাবিশিষ্ট গাছগুলোই ‘মাদার ট্রি’ হিসেবে পরিচিত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে গর্জন, পীতরাজ, ছাতিয়ান, শিমুল, চন্দুল, রং-গামার, অশ্বথ, সুরুজ, বান্দরহোলা, চিকরাশি, বাটনা, গুটগুটিয়া, রক্তন, লোহাকাঠ, পুতিজাম, হুক্কানালি, উরিআম, জগডুমুর, ভাদি ইত্যাদি। এসব গাছ একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পুরো বনের বাস্তুসংস্থানকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখে। একেকটি গাছের বয়স ৫০ বছর থেকে শুরু করে ১০০ বছরেরও বেশি। সুঠামদেহী, সুস্থ বীজ উৎপাদনক্ষম এবং পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির এসব গাছ দীর্ঘদিন ধরে বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে আসছে।
কাপ্তাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক স্বাধীন বলেন, অনেকের ধারণা ছিল রেঞ্জে মাদার ট্রি প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে বনের বিভিন্ন অংশে সার্ভে করে অন্তত ১০০টি শতবর্ষী মাদার ট্রির সন্ধান পাওয়া গেছে, যা আশাব্যঞ্জক। বর্তমানে এসব গাছ সংরক্ষণে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রতিনিয়ত বনে গিয়ে মাদার ট্রিগুলোর সুরক্ষা ও পরিচর্যা নিশ্চিত করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এস এম সাজ্জাদ হোসেনের সার্বক্ষণিক নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে টহল জোরদার করা হয়েছে।
রেঞ্জ কর্মকর্তা আরও বলেন, এসব গাছ টিকে থাকলে বন টিকে থাকবে।” বন উজাড় ও অবৈধভাবে গাছ নিধন বন্ধে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, এসব প্রাচীন গাছ ধ্বংস হলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে।
প্রসঙ্গত, মাদার ট্রি কেবল একটি বড় গাছ নয়; এটি পুরো বনের ইকোসিস্টেমের কেন্দ্রবিন্দু। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, মাটির নিচে ছত্রাকের এক ধরনের জটিল নেটওয়ার্ক (Mycorrhizal network), যা ‘Wood Wide Web’ নামে পরিচিত, তার মাধ্যমে বড় গাছগুলো ছোট ও দুর্বল চারাগাছকে চিনি, জল ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে। কোনো গাছ রোগ বা পোকায় আক্রান্ত হলে এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্য গাছগুলোকে সতর্কবার্তাও পাঠানো হয়।
এ ছাড়া মাদার ট্রি বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখে এবং স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি মাদার ট্রি নষ্ট হলে শুধু একটি গাছই হারায় না, বরং পুরো বনের প্রাকৃতিক যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। তাই বনের পুনর্জন্ম ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এসব প্রাচীন গাছ সংরক্ষণ এখন অত্যন্ত জরুরি।
পাহাড় সব খবর















