Cvoice24.com

যেখান থেকে বিদ্যুৎ যায় সারা দেশে, সেখানেই অন্ধকারে অর্ধশত পরিবার

অর্ণব মল্লিক, কাপ্তাই (রাঙামাটি)
১৭:১৫, ২৮ আগস্ট ২০২৬
যেখান থেকে বিদ্যুৎ যায় সারা দেশে, সেখানেই অন্ধকারে অর্ধশত পরিবার

সন্ধ্যা নামলেই অন্ধকার নেমে আসে পুরো পাড়ায়। হারিকেনের ক্ষীণ আলোয় বই খুলে বসে শিক্ষার্থীরা। কুপিবাতির আলোয় চলে রান্নাবান্না ও সংসারের প্রয়োজনীয় কাজ। বিদ্যুতের আলো যেন এখানকার মানুষের কাছে এখনো দূরের কোনো স্বপ্ন।

অথচ এই অন্ধকার জনপদ থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরেই রয়েছে দেশের ঐতিহাসিক কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। যে কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে দেশের শহর-গ্রাম আলোকিত করছে, সেই কেন্দ্রের এত কাছে থেকেও বিদ্যুতের আলো জ্বলেনি রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার চিৎমরম ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কলাবুনিয়া পাড়ায়।

ছয় দশকের বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎহীন এই পাড়ায় বসবাস করছে অর্ধশতাধিক মারমা পরিবার। স্বাধীনতার এত বছর পরও কুপিবাতি ও হারিকেনের টিমটিমে আলোই তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।

১৯৬২ সালে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর মাধ্যমে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক নতুন যুগের সূচনা হয়। সময়ের সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের পরিধি বেড়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অনেক এলাকাতেও পৌঁছেছে বিদ্যুৎ। তবে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছের কলাবুনিয়া পাড়ায় সেই আলো পৌঁছায়নি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৮৪ সাল থেকে কর্ণফুলী রেঞ্জের আওতাধীন এই এলাকায় মারমা সম্প্রদায়ের মানুষের বসতি গড়ে ওঠে। শুরুতে ১৫টি পরিবার নিয়ে বসতি শুরু হলেও বর্তমানে এখানে অর্ধশতাধিক পরিবারের বসবাস।

স্থানীয়দের দাবি, কর্ণফুলী নদী ও মাঝখানে লুসাই পাহাড় থাকায় ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতার কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে একই ওয়ার্ডের লংকামুখ পাড়া, চংড়াছড়ি পাড়া, আগাপাড়া, নাইন্দমাছড়া পাড়া ও আমতলী পাড়ায় বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে।

বিদ্যুৎহীনতার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে শিশু-কিশোর ও শিক্ষার্থীদের ওপর। এলাকার ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী বাংলাদেশ সুইডেন সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, কর্ণফুলী সরকারি ডিগ্রি কলেজ, কাপ্তাই উচ্চ বিদ্যালয়, শহীদ শামসুদ্দীন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও চিৎমরম উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে।

দিনের আলোয় কোনোভাবে পড়াশোনা করা গেলেও সন্ধ্যা নামার পর শুরু হয় সমস্যা। হারিকেন বা কুপিবাতির ক্ষীণ আলোয় চোখের ওপর চাপ নিয়ে পড়তে হয় তাদের। সচ্ছল দু-একটি পরিবার সোলার প্যানেল ব্যবহার করলেও অধিকাংশ পরিবারের সেই সামর্থ্য নেই।

স্থানীয় সমাজসেবক সুচিংপ্রু মারমা বলেন, ‘ডিজিটাল যুগে এসেও আমাদের ছেলেমেয়েরা আলোর মুখ দেখছে না। এলাকার সামান্য সচ্ছল দু-একটি পরিবার নিজ দায়িত্বে সোলার প্যানেল ব্যবহার করলেও অধিকাংশ অসচ্ছল পরিবার তা কিনতে না পারায় আজও হারিকেনের আলোয় রাত পার করছে। পড়াশোনার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে আমাদের সন্তানেরা।’

কলাবুনিয়া পাড়ার হেডম্যান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যুগের পর যুগ ধরে পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করলেও নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক নেতাদের বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু ভোট শেষ হলে পাহাড়বাসীর এই কষ্টের কথা আর কেউ মনে রাখেন না।’

চিৎমরম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওয়েশ্লিমং চৌধুরী বলেন, ‘জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে অত্যন্ত কাছে হওয়া সত্ত্বেও নানা জটিলতার কারণে এখানে আলো পৌঁছানো যায়নি। আমরা বারবার সংশ্লিষ্ট মহলে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু কাজটি এখনো না হওয়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক।’

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, কলাবুনিয়া পাড়ায় বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে হলে নিকটস্থ বিদ্যুৎ লাইন থেকে আনুমানিক ৪০ থেকে ৪৫টি নতুন বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন করতে হবে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এ বিষয়ে তাদের দপ্তরে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়নি।

কাপ্তাই বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসিক প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘কলাবুনিয়া পাড়ায় বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়ে তাদের দপ্তরে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেনি। তবে তিনি দ্রুত এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।’

কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আলো ছড়াচ্ছে। অথচ সেই কেন্দ্রের মাত্র তিন কিলোমিটার দূরের কলাবুনিয়া পাড়ায় সন্ধ্যা নামলেই জ্বলে হারিকেন।

একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের এত কাছে থেকেও একটি জনপদের ছয় দশকের অন্ধকার—এই বৈপরীত্যের অবসান কবে হবে, সেটিই এখন কলাবুনিয়া পাড়ার মানুষের অপেক্ষা।

পাহাড় সব খবর