মানবমুক্তির অগ্রদূত বিশ্ব অলি সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী
এমএ মুরাদ
স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্ক হলো এক গভীর অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। আমরা স্রষ্টা (আল্লাহ) কে খুঁজে পাই সৃষ্টির মাঝে, তিনি নৈরাকার। কিন্তু এমন কিছু তিনি সৃজন করেছেন, যেমন চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, তারা, আসমান, জমিন। মহান আল্লাহপাক এই পৃথিবীতে প্রায় আঠার হাজার মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন। আর এই সকল সৃষ্টির মাঝে শ্রেষ্ঠ হলো মানুষ।
মানুষকে আল্লাহপাক সৃষ্টি করেছেন সুন্দর আকার এবং আকৃতিতে আর তাকে দিয়েছেন চিন্তা করার এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, আল্লাহপাক তা আর কোন সৃষ্টিকে দেননি। আর অসিম এই মহাবিশ্বে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে চিন্তাশীল মানুষের জন্য।
পবিত্র আল কোরানের বাণী, মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, “নিশ্চয় আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিলিত শুক্রবিন্দু হতে, যাতে আমি থাকে পরীক্ষা করি, এই জন্য আমি তাকে করেছি শ্রবণ ও দৃষ্টি শক্তিসম্পন্ন। —(সূরা আল ইনসান : আয়াত ২)
যুগে যুগে মহান রাব্বুল আলামীন সৃষ্টিজগতে বিশ্বমানবতার কল্যাণে অসংখ্য নবি, রাসুল, গাউস, অলি, কুতুব প্রেরণ করেছেন। তার মধ্যে হজরত আদম (আ.) মানবজাতির প্রথম নবি হিসেবে পরিচিত। আখেরি নবি হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (দ.) হলেন নবুয়ত পরিসমাপ্তকারী ও দ্বীন ইসলামের পূর্ণতাদানকারী। রাসুলে পাক (দ.) বিশ্ববাসী সত্যের পথে পরিচালিত হবার লক্ষ্য বিদায় হজের ভাষণে দুইটি নেয়ামতের কথা উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে একটি হলো ‘কিতাবুল্লাহ্’ বা আল্লাহ কিতাব অপরটি হলো আহলে বায়াত।
আহলে বায়াতের অনুসারীগণ হচ্ছেন কোরান-সুন্নাহ্ প্রকৃত হেফাজতকারী, মানবজাতির জন্য আলোকবর্তিকা, তাওহিদ (আল্লাহ একত্ববাদ) ও ইবাদতের আদেশ করা, শিরক, কুফর ও পাপ কর্ম থেকে নিষেধ করা, মানুষকে সৎ কাজের নির্দেশ দেওয়া তাঁদের মূল বার্তা ছিলো এটি। আখেরি নবি রাহমতুল্লিল আলামীন হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (দ.)’র মাধ্যমে নবুয়ত পরিসমাপ্তি ঘটালে ও আহলে বায়াত- এ -রাসুল (দ.) তথা আল্লাহ অলিগণের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার বিদ্যমান রয়েছে।
পবিত্র কোরআনে সূরা নিসার ৫৯নং আয়াতে বলা হয়েছে, ইয়া আইয়ুহাল্লাজিনা আমানু, আতিউল্লা ওয়া আতিউর রাসুল, ওয়া ওলিল আমরি মিনকুম, এই আয়াতের মূল বার্তা হচ্ছে হে ইমানদারগণ তোমরা আল্লাহ আনুগত্য কর, রাসুল (দ.)’র আনুগত্য কর ও তোমাদের মধ্যে যারা উলিল আমর তাদের আনুগত্য কর। এখানে ইমানদারগণদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, ওলিল, আমর বলতে সে সব ব্যক্তিদের কে বুঝায় যাদের হাতে কোন বিষয়ের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।
এখানে সুফি সাধকদের কথা স্পষ্ট, সুফি সাধকরা “তাসাওউফ” নামক আধ্যাত্মিক পথে জীবন যাপন করেন যার লক্ষ্য হলো আত্মা সংযম, জ্ঞান অর্জন এবং আল্লাহ প্রতি প্রেম ও ভক্তির মাধ্যমে আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করা। তেমনি একজন মহান সাধক সিদ্ধপুরুষ মারজাল বাহরাইন বিশ্ব অলি শাহানশাহ্ হজরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) [১৯২৮-১৯৮৮]। এই মহান সাধক হচ্ছেন মাইজভাণ্ডারী তরিকার আধ্যাত্মিক শরাফতের প্রাণপুরুষ ইমামুল আওলিয়া হুজুর গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী (ক.)’র প্রপৌত্র ও অছি-এ গাউসুল আযম খাদেমুল ফোকরা শাহ্ সুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.)’র বড় পুত্র।
জন্ম : ১০ পৌষ, ১৩৩৫ বঙ্গাব্দ, ১২ রজব ১৩৪৭ হিজরি, ২৫ ডিসেম্বর ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দ মঙ্গলবার সোবেহ সাদিকের সময় জন্মগ্রহণ করেন। সপ্তম দিবসে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় শিশুর নাম রাখা হয় সৈয়দ বদিউর রহমান। কিন্তু নবজাতকের এই নামকরণের পর স্বপ্নে শিশুর পিতাকে হজরত গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী (ক.) বলেন, শিশুর নাম রাখুন “সৈয়দ জিয়াউল হক”। সাথে সাথে পরদিনই পুনঃঅনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। গরু জবেহ করে নাম রাখা হলো সৈয়দ জিয়াউল হক।
তিনি (শাহানশাহ্ হজরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) জীবনাদর্শ ছিল ভিন্ন, তিনি প্রায়শ মগ্ন চেতনায় থাকতেন। হাফেজ সিরাজীর (র.)’র ভাষায়, পর্দার আড়ালে যে রহস্য তা বিভোরচিত্তদের নিকট খোঁজ কর। মাঝে মধ্যে গেয়ে উঠতেন— ‘এই যে দুনিয়া কীসের লাগিয়া, এত যত্ন গড়িয়েছেন সাই’ মূলত সুফিগণ দুনিয়ার মায়ামোহ থেকে বিমুখী।
শাহানশাহ্ হজরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) ছিলেন অনেক গুণে গুণান্বিত, তাঁর নিকট বর্ণগত ও ধর্মগত কোন ভেদাভেদ ছিলো না। তিনি জাতি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার কথা শুনতেন ও সমাধান দিতেন। তিনি অনেক কঠোর রিয়াজত সাধনা করেছেন। তাঁর এই অবস্থা দেখে পরিবারের সবাই যখন দিশেহারা, তখন হুজুর ইমামুল আউলিয়া গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী (ক.) কালাম করেছেন, আমি তোমাদের জন্য জিয়াউল হক কে চেরাগ জালাচ্ছি, বাতি জালাচ্ছি।
সেই আলোই আজ বিশ্ববাসী আলোকিত। তিনি মানবজাতির কল্যাণের এক রোল মডেল, মানুষের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা, তিনি মানবজাতিকে সত্যের পথে, হকের পথে আহ্বান করেছেন, এক কালামে বলেছেন, মানুষ আমার কাছে আসে দুনিয়া, টাকা-পয়সা, ধন-দৌলতের জন্য, খোদা তালাসি কেউ আসে না, যদি আসত, আমি তাদেরকে খোদা পর্যন্ত পৌঁছে দিতাম।
বিশ্বঅলির হায়াতে জীবন মানব সেবাই অতিবাহিত করেছেন, তিনি কালাম করেছেন মানবসেবা আল্লাহ ইবাদত। তিনি বার বার হজ পালনে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন দুস্থ মানুষের সেবাই হজে আকবর। তিনি আধ্যাত্মিক শক্তি বলে বুঝতে পারতেন কখন কার কি প্রয়োজন, তিনি একদা কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে ফেরার পথে এক অবাক কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন।
গরিব এক মাছ বিক্রেতা অল্প কিছু মাছ নিয়ে রাস্তার পাশে বসে আছেন শাহানশাহ্ হুজুরের গাড়ি আমিরাবাদ পৌঁছা মাত্র ড্রাইভারকে আদেশ দিলেন গাড়ি থামাও। তিনি মাছ বিক্রেতাকে বললেন ব্যাগ মুড়িয়ে সবগুলো মাছ দিতে এবং সাথে সাথে তিনি উক্ত মাছ বিক্রেতাকে নগদ ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে দিলেন তাকে বললেন তোমার মেয়ের বিয়ের জন্য। মাছ বিক্রেতা হতভম্ব হয়ে গেলেন, এই যেন আল্লাহ ফেরেশতা, এই রকম অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা বিদ্যমান।
একবার চট্টগ্রাম শহরে হজরত শাহ্ আমানত খান মাজার লেইন এক মেথর কে নতুন কাপড়, জামা, সাবান কিনে গোসল করিয়ে হাতের ঘড়ি ও নগদ পঁচিশ হাজার টাকা হাতে দিয়ে হুকুম দিলেন আপনি বাসায় গিয়ে আল্লাহ আল্লাহ জিকির করেন। তাঁর কাছে জাতের কোন ভেদাভেদ ছিলো না, তাই তিনি বলেছেন, ‘আমার দরবার আল্লাহ ঘর, প্রাচ্যের বাইতুল মোকাদ্দস, সকল জাতির মিলন কেন্দ্র।’
আজ ও তাঁর পবিত্র দরবার থেকে মানবজাতির সেবা চলমান। তাঁর একমাত্র নুরানী সাহেবে আওলাদ, আওলাদ এ রাসুল (দ.) রাহবারে আলম হজরত শাহ্ সুফি সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী (ম. জি. আ.) প্রকাশ মওলা হুজুর এর নিত্য নতুন পদক্ষেপে বিভিন্নভাবে জনকল্যাণমুখী কাজ করে বিশ্বের দরবারে প্রশংসনীয় হয়েছেন।
বিশ্বঅলি শাহানশাহ্ বাবাজানের একটি কালামও আছেন, “আমার হাসান মিয়া আল্লাহ মস্ত বড় অলি-আল্লাহ, জগতের কল্যাণের জন্য এসেছেন, সাধ্য মতো ইজ্জত-সম্মান করবেন। তিনি মওলা হুজুর মাইজভাণ্ডারী (ম.) গড়ে তুলেছেন শাহানশাহ্ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী ট্রাস্ট, যেখান থেকে প্রতিনিয়ত অসংখ্য সেবা প্রধান করা হচ্ছে, চট্টগ্রাম কিডনি হাসপাতাল কোটি টাকা, চট্টগ্রাম মেডিকেলে কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিন, বহুমাত্রিক কল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠানসমূহ, শিক্ষা ও শিক্ষাবৃত্তি প্রকল্প, দারিদ্র্য বিমোচন ও আর্থিক সহায়তা প্রকল্প, সংগীত ও সংস্কৃতি চর্চা প্রকল্প, জনসেবা প্রকল্প।
ওরশ শরিফে আসা হাদিয়া ও দৈনন্দিন আশেক ভক্তের দেওয়া হাদিয়া মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিচ্ছেন। মাইজভাণ্ডারী গাউসিয়া হক কমিটি দেশ বিদেশে সংগঠনের মাধ্যমে সবাই কে মানবতার খেদমতে অংশীদার হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি মাত্র ৬০ বছর বয়সে ১৯৮৮ সনে ১২ অক্টোবর বুধবার রাত ১২টা ২৭ মিনিটে চট্টগ্রাম বন্দর হাসপাতালে বেছাল (পর্দা) করেন।
আগামী ১১ অক্টোবর ২০২৫ ইং এই মহান সাধকের পবিত্র ৩৭তম বার্ষিক উরশ শরীফ যথাযোগ্য মর্যাদায় চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ গাউসিয়া হক মঞ্জিলে আওলাদ-এ-রাসুল (দ.) রাহবারে আলম হজরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী (ম. জি. আ.) প্রকাশ মওলা হুজুর-এর সদারতে অনুষ্ঠিত হবে। এই উপলক্ষ্যে শাহানশাহ্ হজরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। আল্লাহ এই মহান অলির পবিত্র ওরশ শরীফের ফয়ুজাত আমাদের সকলের ওপর বর্ষিত হউক আমিন, বেহুরমতে স্যাদুল মুরসালীন।

লেখক : প্রাবন্ধিক।
ধর্ম সব খবর















