Cvoice24.com

হাকীমে তরীকত হযরত সৈয়দ বাচা মিঞা শাহ ফতেপুরী (রহ.)

লিখেছেন : শাহজাদী সৈয়দা সিরাজুম মুনীরা
১৮:০৮, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
হাকীমে তরীকত হযরত সৈয়দ বাচা মিঞা শাহ ফতেপুরী (রহ.)

সেই মহান নুরী স্বত্তার রাতুল চরণে তাহিয়াতুস সূজদ পেশ করছি, যিনি কাওছারী নহর স্বীয় আহলে বায়তে আতহার (আ.) রেখে গেছেন মহান রবের রাজ হিসেবে এবং আসহাবগণের আলোকবর্তিকারুপে। প্রাণতূল্য মওলা নবী সরওয়ারে কায়েনাৎ (দ.)'র পবিত্র রক্তধারার স্বার্থক উত্তরাধিকারী কাবায়ে হাকিকী ইমামুল আউলিয়া হযরত গাউসুল আজম মাইজভান্ডারী (ক)'র বেলায়তী ফুয়ুজাতের বদৌলতে সৃষ্টি হয়েছে অজস্র উচ্চমার্গীয় অলীয়ে কামিলগণ। যাঁদের জীবন প্রকৃতিতে রয়েছে খোদায়ী শক্তিমত্ত্বা-প্রেম-প্রেরণা, সাফল্য ও স্বার্থকতার উৎস। এপার বাংলা-ওপার বাংলার বৃহত্তর পরিমণ্ডলের বিশাল অংশজুড়ে আছেন মাইজভান্ডারী বেলায়তের মহান অলিওল্লাহগণ।

হযরত কেবলা ও বাবা ভান্ডারী কেবলার প্রত্যক্ষ ছোহবতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে মাইজভান্ডারীদের আত্মসমর্পণ, প্রেম-ভক্তি-ধর্ম-কর্ম, ঈমান-ইয়াকিন-তাকওয়াহ-তাওয়াক্কুল, আদর্শ-আহকাম, জিকির-আজকার, ওয়াজদ-ছামাহ্-বন্দেগী, বিলীনতা-উপলব্ধি, সহ্য-ধৈর্য-উদারতা, সত্য-সততা, চরিত্র-নীতি-নৈতিকতা-মানবতা, আধ্যাত্মিকতা-ধ্যান-জ্ঞান, মন-মনন, চিন্তা-চেতনা-নিষ্ঠা-রুহী নিসবৎ-মুয়ামেলাত, কাশফ-কারামত, বেশারত-ইলহাম-ইলকাহ্-ফানায়িয়াত, বকায়িয়ত-মকাম-তালকিন, খিদমত- হিকমত-এশায়াত এরই ধারাবাহিকতায় বাংলার বুকে প্রবর্ত্তিত হয় একমাত্র অর্গলমুক্ত সিলসিলা ‘তরীকায়ে মাইজভান্ডারীয়া’!

গাউসুল আজম মাইজভান্ডারী (ক.)'র রুহানি তাছাররুফ্ফাত গুনে সে সমস্ত আউলীয়াগণ পয়দা করেছেন -অলিউল জজব্ কুদওয়াতুল আছফিয়া হযরত শাহে ফতেপুরী (রহ.) তন্মধ্যে অন্যতম। মাইজভান্ডারী ওয়াহদানিয়ত, রুহানীয়ত, কোরবানী, ইশ্ক, জজব, আদব, শরাফত ইত্যাদির অনন্য দৃষ্টান্ত হযরত ফতেপুরী কেবলা (রহ)। প্রচলিত কথন, "যদি আদব শিখতে চাও, ফতেপুরীর দরবারে যাও"।

হযরত গাউসুল আযম মাইজভান্ডারীর পাক মর্জি মোতাবেক স্বিয় ভ্রাতা সৈয়দ আব্দুল করিম শাহ মাইজভান্ডারী (র)'র শাহযাদী ও হযরত বাবা ভান্ডারী (ক.)'র সহোদরা ভগ্নি হওয়ায় স্বীয় সহধর্মিনী মুহতারিমা সৈয়দা আফিওন নিছা মাইজভান্ডারী (রহ.)-কে মুনিবের আওলাদ হিসেবে কী পরিমাণ যে মূল্যায়ন করতেন পার্থিব পরিভাষায় তা ব্যাক্ত করার মত নয়। হাটহাজারী উপজেলার গড়দুয়ারা গ্রামের প্রসিদ্ধ ধর্মীয় ব্যাক্তিত্ত্ব হযরত সৈয়দ জয়নুল্লাহ মিয়াজীর ৭ কন্যার একভাই হলেন হযরত শাহ্ ফতেপুরী।

তিনি হাটহাজারী থানার অন্তর্গত গড়দুয়ারা গ্রামে সম্ভ্রান্ত সা'দাত পরিবারে ১৮৫৫ সালে ৭ ফাল্গুন ২০ ফেব্রুয়ারী পিতা হযরত মৌলানা সৈয়দ জয়নুল আলী শাহ (রা:) (প্রকাশ জান আলী মিয়াজী)'র এবং মাতা সৈয়দা সুফিয়া খাতুনের ঘর আলোকিত করেন। শুভক্ষণে আকিকার পর নামকরণ করা হয় "সৈয়দ আমিনুল হক", অতি শৈশবে ফতেপুরী শাহ্ (র:) তাঁর ভগ্নিপতি হযরত গাউসুল আজম মাইজভান্ডারীর আপন ভাগিনা চিকদাইর নিবাসী হযরত সৈয়দ  কলিম উল্লাহ শাহ্ (র:)'র সাথে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে গমন করার সাথে সাথে হযরত আকদাছ (ক.) এর হাতে মওলা আলী (ক.) ন্যায় দস্তে বায়াতের মাধ্যমে তরীকত অঙ্গনে প্রবেশ করেন। পারিবারিকভাবে সৈয়দ আমিনুল হক নামে পরিচিতি লাভ করলেও  হযরত গাউসুল আজম মৌলানা সৈয়দ আহম্মদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (কঃ) স্নেহবশে ফতেপুরী (র:) কে "বাঁচা মিয়া" নামে ডাকতেন। এটি তাঁর রূপমূলক এসতেলাহী কালাম বা কথাভঙ্গী।

পরবর্তী সময়ে গাউসে  মাইজভান্ডারী (কঃ) স্নেহ বশে ফতেপুরী (রঃ) কে "বাঁচা মিয়া" নামে ডাকার কারণে সাহাবীয়ে রাসূল (সা:) হযরত আবু হুরায়রার (রা:) ন্যায় ফতেপুরী শাহ্ (রাঃ) আপন মুনিব মওলার পবিত্র কালামকে ইছমে মোবারকা হিসেবে "বাঁচা মিয়া" নামটি মশহুর করান। তিনি পরবর্তী জীবনে সৈয়দ আমিনুল হক নামটি আর ব্যবহার করেননি। শৈশব কালীন পারিবারিকে আবহে শিক্ষা সমাপনান্তে উচ্চ শিক্ষার্থে মোহছেনীয়া মাদ্রাসায় জামাতে উলায় ‍কৃতিত্তের সাথে পরীক্ষায় পাশ হওয়ার পর দ্বীন ইসলামের খেদমতে মনোনিবেশ করেন।

একদিন জুমার নামাজে খুতবা শরীফ পাঠকালে মাওলায়ী মুরলীর টানে তন্ময় হয়ে গাউসুল আজম হযরত কেবলার নূরী চরণে ছুটে যান। দয়াল গাউসুল আজম আপন নূরী জলওয়ায় মিশিয়ে পরিপূর্ণতা দান পূর্বক দুই দিন পর হুকুম করেন তিনি যেন বার্মা গিয়ে ত্বরিকতের কাজ করেন। হযরত কেবলা (ক.) এর ইচ্ছা মোতাবেক তিনি বার্মায় গিয়ে হাজার হাজার মুক্তিকামী মানবকে ত্বরীকায়ে মাইজভান্ডারীয়ায় দাখিল করান। দুই বছর পর আপন মুর্শিদ হযরত কেবলা কাবার রুহানী নির্দেশে মাতৃভূমিতে ফিরে নিজ গ্রাম গড়দুয়ারায় ত্বরিকতের কার্যক্রম শুরু করেন।

এলাকায় তখনকার নবী-অলী দ্রোহিরা তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকার ষড়যন্ত্র শুরু করে দিলে, সুন্নতে রসূলের এত্তেবায় মওলার মর্জিতে স্বীয় জন্মস্থান গড়দুয়ারা থেকে ফতেপুর গ্রামে ১৯১৬ সালে হযরত কেবলা কাবার অনতম প্রধান খলিফা হযরত শেখ অসিয়র রহমান ফারুকী চরণদ্বীপি (রহ.)‘র মধ্যস্থতায় হিজরত করেন। মওলা আলম বাবা ভান্ডারীর (ক.) অভিষেককালিন সময়ে, "তুম্ লোগোকা ইবতেদা আওর ইনতেহা ম্যারা মিঞাকা (বাবা ভান্ডারী) হাতোমে হ্যায়"  হযরত কেবলা কাবার (ক.) রাজ রহস্যপূর্ণ এ কালামে পাকের আনুগত্যতায় "ছদ্দকতা" বলে তিনি অবনত চিত্তে হযরত কেবলা ও আপন শ্যালক বাবা ভান্ডারী কেবলাকে অভিন্ন সত্ত্বা জ্ঞানে যুগল গাউসুল আজম রুপে মেনে ।তাঁদের সান্নিদ্ধে থেকে উচ্চমানের অলীয়ে রব্বানীতে পরিনত হন হযরত ফতেপুরী।

ত্বরীকতের শুদ্ধতা বজায় রাখার জন্য তিনি কঠোর নিয়মে আদব কায়দার তলকীন প্রদান করতেন। হযরত কেবলা (ক.) ও বাবা ভান্ডারী কেবলার সকল উচ্চস্থানীয় খলিফারাও তাঁকে অত্যন্ত সমীহ করতেন। নিয়ম মোতাবেক মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে আসা-যাওয়ার প্রক্কালে শাহান শাহ্ ফতেপুরীর সান্নিধ্যে আসা এখনও ছুফিয়ানে কেরাম ও সালফে সালেহীনগণ তাঁর পদাংক অনুসরণ করে থাকেন। তাঁর ফয়েজপ্রাপ্ত স্নেহধন্য অনেকে  উচ্চস্তরের বেলায়াত ধারী অলী উল্লাহ হিসেবে পরিণত হয়েছেন।

ত্বরিকায়ে মাইজভাণ্ডারীয়ার রাজ রহস্যের উদঘাটক শাহান শাহ ফতেপুরী আজীবন ত্বরীকতের খেদমতে হাজার হাজার মওলা তালাশকারীদের ত্বরীকতের উচ্চসোপানে অবগাহন করিয়ে মাশুকে হাকীকির নূরী রঙ্গে রঞ্জিত হয়ে ১৯৪৯ ঈসায়ী ২৪ সেপ্টেম্বর ৭ই আশ্বিন, ১০ জিলহজ্ব, জুমাবার পবিত্র ঈদুল আযহার দিবাগত রাত্রি ১২:০১ মি. হযরত সৈয়দুনা ইসমাইল জাবিহুল্লার প্রেমের কুরবানির স্রোত ধারায় মওলায়ে হাক্বীকীর দরবারে প্রেমিকরাজ রূপে নিজেকে সমর্পন করেন।

তাঁর পবিত্র রওজার শিরোপরে রয়েছে হযরত কেবলা (ক.) ও বাবাজান কেবলার (ক.) জিসমানী তাবাররোকাত (হযরত কেবলার পবিত্র নালাইন শরীফ, লাঠি মোবারক এবং বাবা ভান্ডারী কেবলার দন্দান মোবারক, চাদর মোবারক ও পবিত্র চুল মোবারক), প্রতিনিয়ত অসংখ্য ভক্ত জায়েরীনগণ তাঁর রওজা ফতেপুর দরবার শরীফে এসে প্রেম ও জজবার সরোবরে অবগাহন করেন।
 

লেখক : আওলাদ, ফতেপুর দরবার শরীফ; শিক্ষক, ফতেপুর মেহেরনেগা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়।