রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্য, আতঙ্কে বাসিন্দারা
শহিদুল ইসলাম, কক্সবাজার প্রতিনিধি, সিভয়েস২৪
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার বালুখালী ৮ ওয়েস্ট রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্যে সাধারণ রোহিঙ্গারা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ক্যাম্পের একাধিক বাসিন্দার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র মাদক পাচার, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করলে অপহরণ, নির্যাতন কিংবা প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
সম্প্রতি সরেজমিনে বালুখালী ৮ ওয়েস্ট রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে কয়েকজন নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অপরাধী চক্রের ভয়ে অনেকে সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে বের হতে সাহস পান না। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আতঙ্কের কারণে কিছু পরিবার অন্য ক্যাম্প কিংবা আত্মীয়-স্বজনের কাছে আশ্রয় নিয়েছেন বলেও জানান স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় কথিত শীর্ষ মাদক কারবারী নবী হোসেন গ্রুপের কয়েকজন সদস্য বালুখালী ৮ ওয়েস্ট ক্যাম্পে অবস্থান করে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। তাদের মাধ্যমে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক ক্যাম্পে এনে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হয়। পাশাপাশি অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উঠেছে তারা হলেন— আমিন উল্লাহ, নুর কামাল, মোহাম্মদ আয়ুব ও ফয়েজ কামাল। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, আমিন উল্লাহ অতীতে আরসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বর্তমানে কথিত নবী হোসেন গ্রুপের হয়ে ক্যাম্পে প্রভাব বিস্তার করছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ক্যাম্পের বাসিন্দা শামসুল আলম বলেন, ‘তাদের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আমি অন্য ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছি। তারা নিয়মিত মাদকের চালান নিয়ে আসে। কেউ প্রতিবাদ করলে ধরে নিয়ে যায় কিংবা হত্যার হুমকি দেয়। তাই ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চায় না।’
আরেক বাসিন্দা সলিমা খাতুন বলেন, ‘আমরা শান্তিতে বসবাস করতে চাই। কিন্তু প্রতি মাসে চাঁদা দিতে বাধ্য করা হয়। টাকা দিতে না পারলে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়। প্রশাসনের কাছে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, ‘মাঝেমধ্যে লোকজনকে ধরে নিয়ে যায়। পরে পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়। আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকি।’
আরও কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, অপরাধী চক্রের সদস্যরা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখায়। কেউ প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করলে পরবর্তীতে তাকে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ক্যাম্প প্রশাসনকে একাধিকবার মৌখিকভাবে বিষয়টি জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে এ দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্তদের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ না করায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বালুখালী ৮ ওয়েস্ট রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ক্যাম্প ইনচার্জ (সিআইসি) রিন্টু বিকাশ চাকমা বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) সিরাজ আমিন বলেন, ‘এ ধরনের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। সুনির্দিষ্ট তথ্য বা অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে, ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গারা বালুখালী ৮ ওয়েস্ট ক্যাম্পে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং সাধারণ রোহিঙ্গারা নিরাপদ পরিবেশে বসবাস করতে পারবেন।
কক্সবাজার সব খবর















