গানে, স্মৃতিতে ও শ্রদ্ধায় আইয়ুব বাচ্চুকে স্মরণ, আবেগাপ্লুত চট্টগ্রাম
বিনোদন ডেস্ক
চট্টগ্রামের মাটি থেকে উঠে এসে যিনি বাংলা ব্যান্ডসংগীতকে পৌঁছে দিয়েছিলেন অনন্য উচ্চতায়, গিটারের জাদুকরি সুরে জয় করেছিলেন কোটি মানুষের হৃদয়—সেই কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুকে স্মরণ করল তার প্রিয় শহর চট্টগ্রাম। গানে, স্মৃতিচারণে আর গভীর শ্রদ্ধায় আবেগঘন হয়ে উঠল স্মরণসভা। একই আয়োজনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হলো সংগঠনের প্রয়াত সদস্য সাফাত ইব্রাহিমকেও।
দেশের ব্যান্ডসংগীতের কিংবদন্তি, লিড গিটারিস্ট ও একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুর অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী এবং সাফাত ইব্রাহিমের স্মরণে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেল ৫টায় চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির গ্যালারি হলে এ আলোচনা ও স্মরণসভার আয়োজন করে ‘চাটগাঁইয়্যা নওজোয়ান’।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, মিলাদ এবং প্রয়াতদের রুহের মাগফেরাত কামনায় মোনাজাত পরিচালনা করেন মাওলানা মাহমুদুর রহমান। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রকিবুল হাসান সোহেলের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় স্মরণসভা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মাহবুবুর রহমান সাগর ও প্রবীর পাল।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রবীর পাল কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুর বর্ণাঢ্য জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন। এরপর মিন্টুর বাঁশিতে বেজে ওঠে আইয়ুব বাচ্চুর কালজয়ী গান ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে’। প্রিয় শিল্পীর পরিচিত সুরে মুহূর্তেই মিলনায়তনে নেমে আসে আবেগঘন পরিবেশ। উপস্থিত অনেকের কাছে যেন ফিরে আসে স্মৃতির পুরোনো দিনগুলো—গিটারের তারে বাঁধা অসংখ্য গান, ভালোবাসা আর মুগ্ধতার মুহূর্ত।
স্মরণসভায় বক্তারা বলেন, আইয়ুব বাচ্চু কেবল একজন সংগীতশিল্পী বা গিটারিস্ট ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলা ব্যান্ডসংগীতের এক উজ্জ্বল পথপ্রদর্শক। চট্টগ্রাম থেকে উঠে এসে নিজের প্রতিভা, সৃজনশীলতা ও সাধনার মধ্য দিয়ে তিনি দেশের সংগীতজগৎকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তার সৃষ্টি, সুর ও সংগীতের প্রতি ভালোবাসা চিরকাল শ্রোতা এবং নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।
একই সঙ্গে সাফাত ইব্রাহিমের অকালপ্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেন বক্তারা। সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ও অবদানের কথা স্মরণ করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান উপস্থিত সবাই।
স্মরণসভার সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি ছিল সংগঠনের সভাপতি জামাল আহমেদের সমাপনী বক্তব্য। আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে নিজের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘একজন নিরহংকারী, সাদামনের মানুষ ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু স্যার। তিনি ছিলেন আমার রিয়েল বস। তিনিই আমাকে স্টিক ধরা শিখিয়েছেন। তার কারণেই আজ আমি আমার নামের পাশে ‘যন্ত্রী’ শব্দটি বসাতে পেরেছি। তিনি ছিলেন আমার শিক্ষাগুরু।’
তার এই স্মৃতিচারণে উঠে আসে আইয়ুব বাচ্চুর শিল্পীসত্তার পাশাপাশি একজন শিক্ষক, অভিভাবক ও অনুপ্রেরণাদায়ী মানুষের প্রতিচ্ছবি। যার কাছ থেকে শুধু সংগীতের পাঠ নয়, নিজের পরিচয় গড়ে তোলার প্রেরণাও পেয়েছেন অনেকে।
অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য রাখেন স্পাইডার ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা জেকব ডায়াস, সিএমবির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলী, শিল্পী আব্দুর রহিম, স্পার্কের ইকবাল, সাফাত ইব্রাহিমের মেয়ে রাদিয়া ইব্রাহিম, সিনিয়র সদস্য আবু তাহের চৌধুরী, সদস্য এবি রুবেল, এলআরবির সাবেক ড্রামার রোমেল, উপকূল সাংস্কৃতিক ফোরামের সভাপতি এনায়েত হোসাইন পলাশ, কার্যকরী সদস্য লায়ন হাজী মো. ইসমাইল, সহসাধারণ সম্পাদক শহিদুল হক চৌধুরী ও আবদুর রাজ্জাক এবং তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক নাদিরা সুলতানা হেলেন।
এ ছাড়া বক্তব্য ও স্মৃতিচারণে অংশ নেন মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আফরোজা সুলতানা শিউলী, সহসভাপতি তাহের মিয়া, লায়ন এম. এ. মুছা বাবলু, দোস্ত মোহাম্মদ, আশরাফ উদ্দিন মাহমুদ ও মো. ইলিয়াছ ইলু, ওমর আলী রনি, মনজুরুল আলম, আবুল কালাম, সদস্য ইকবাল পিন্টু, উসমান গনি লিটনসহ সংগঠনের অন্যান্য সদস্য ও আমন্ত্রিত অতিথিরা।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে এলআরবির সাবেক ড্রামার রোমেলসহ উপস্থিত শিল্পী ও সংগীতপ্রেমীরা গানে গানে শ্রদ্ধা জানান আইয়ুব বাচ্চুকে। প্রিয় শিল্পীর সুরে তাকে স্মরণ করার মধ্য দিয়ে শেষ হয় আয়োজন।
আইয়ুব বাচ্চু আজ আর সশরীরে নেই, কিন্তু তার গিটারের সুর, গান আর সংগীতের প্রতি নিবেদন এখনো অগণিত মানুষের হৃদয়ে অমলিন। চাটগাঁইয়্যা নওজোয়ানের এ স্মরণসভা যেন আবারও মনে করিয়ে দিল—একজন সত্যিকারের শিল্পীর প্রস্থান হয়, কিন্তু তার সৃষ্টি ও অনুপ্রেরণার মৃত্যু হয় না।
বিনোদন সব খবর















