কবি নজরুল ঐক্যে বিশ্বাস করতেন
নজরুল সংগীতের প্রতি আমার ভালোলাগা তৈরী হয়েছিল একেবারে ছেলে বেলা থেকেই। তার প্রধান কারণ যদিও পারিবারিক পরিবেশ তা সত্ত্বেও একটু বড় হয়ে যখন ভাবার চেষ্টা করেছি মূলত; কি কারণে তাঁর গান আমাকে এতো আকৃষ্ট করে, তখন আরও অনেক উত্তরের সাথে, একটি কথাই বার বার মনে হয়েছে, তাঁর গানের বিষয়-বৈচিত্র্য। ছোটবেলায় মা-ও গলায় নজরুল সংগীত শুনেই বড় হয়ে উঠা।
তারপর ক্রমশ; বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে পছন্দের গান শোনা। কতধরণের গান যে নজরুল ইসলাম সৃষ্টি করেছেন, তা ভাবলে সত্যিই অবাক হতে হয়। প্রতিটি পর্যায়ের মধ্যে আজ তাঁর লোক আঙ্গিকের গান নিয়ে কিছু তথ্য তুলে ধরবো।
নজরুল ছিলেন প্রকৃতি প্রেমী। তাঁর জম্মস্থান বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে। ফলে গ্রাম্য পরিবেশেই তাঁর বেড়ে উঠা। শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের প্রারম্ভিক বয়স পর্যন্ত তিনি মূলত গ্রামেই কাটিয়েছেন। মাঝে মধ্যে কর্মের তাগিদে শহরে ও গ্রাম বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁকে বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল গান রচনায়-‘ নম:নম:নম: বাংলাদেশ মম’’ গানটিতে তিনি সুনিপুণভাবে বর্ণনা করেছেন ঋতুভেদে বাংলার বৈচিত্র্য।
বালক বয়স থেকেই সুযোগ পেলে নজরুল চুরুলিয়ায় লেটোর দলে গান শুনতে যেতেন। তাঁর কাকার একটি লেটোদল ছিল। এভাবেই তাঁর লেটো গানের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকে। ‘আয় পাষ- যুদ্ধ দে তুই’ তাঁর লেখা জনপ্রিয় একটি লেটোগান গুলির একটি। লেটো গানের জন্য অনেক গুলি পালা তিনি রচনা করেছিলেন। যেমন ‘শকুনি বধ’, ‘রাজপুত্র’, ‘দাতাকর্ন’, ‘মেঘনাদ বধ’ ইত্যাদি। দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর নজরুল যুদ্ধে যোগ দেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে তিনি সাহিত্য রচনায় মন দেন। ১৯২১ ভারতী পত্রিকাতে তাঁর পলাতক কবিতাটি (বা গানটি) প্রকাশিত হয়।
গানটির প্রথম লাইন ‘ কোন সুদূরের চেনা বাঁশির ডাক শুনেছিস, ওরে চখা ওর আমার পলাতকা’। এই গানটি অপূর্ব বাউল সংগীত। বাউল অধ্যুষিত বীরভূমি তাঁর জন্মস্থানের পার্শ্ববর্তী অঞ্চল হওয়ায়, ছোটবেলা থেকেই বাউল গানের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল। তিনি নিজেও স্বভাবে ছিলেন ভবঘুরে ও উদাস। তাঁর বাউল গানের মধ্যেও এই মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ‘আমি ভাই ক্ষ্যাপা বাউল’ গানিট তারই উদাহরণ।
নজরুলের বিভিন্ন আঙ্গিকের গানের মধ্যে ‘ঝুমুর’ অন্যতম। সাঁওতাল অধ্যুষিত অঞ্চলের গান হল ‘ঝুমুর’। ছোটবেলা থেকেই ঝুমুর গানের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। ঝুমুর গানের কথায় ও সুরে তিনি যে বিচিত্রতা এনেছেন, তা এক কথায় অনবদ্য। নাম না জানা স্বল্প পরিচিত ফুল, ফলের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে তাঁর এই গানের মাধ্যমে। ‘এই রাঙ্গা মাটির পথে লো’ ঝুম, ঝুম, ‘ঝুমরা নাচ নেচে কে এলো গো’ গানগুলি তাঁর সৃষ্ট কয়েকটি বহুল পরিচিত ঝুমুর গান।
বেদে-বেদেনীরা ‘সাঁপান গান’ গেয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। নজরুল ইসলাম এই পর্যায়ের কিছু গানও রচনা করেন অসামান্য দক্ষতায়। ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ’ এরকমই একটি জনপ্রিয় সাঁপান গান।
কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ভাওয়াইয়া গান সম্পর্কে ড. অনুপম ঘোষাল তাঁর নজরুলগীতির ‘রূপ ও রসানুভূতি’ গ্রন্থটিতে বলেছেন ‘নজরুল উত্তরবঙ্গের রোমান্টিকধর্মী ভাওয়াইয়া গানে আকৃষ্ট হয়েছিলেন কলকাতায় গ্রামোফোনের রিবার্সোল রূমে বিখ্যাত ভাওয়াইয়া শিল্পী আব্বাস উদ্দীন আহমেদের গান শুনে। সে প্রসঙ্গে আব্বাস সাহেব তার ‘শিল্পীজীবনের কথা’ গ্রন্থে কিছু স্মৃতিচারণ করেছেন। আব্বাস উদ্দীনের কন্ঠে একদিন নজরুল একটি প্রচলিত ভাওয়াইয়া গান শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন। সেই গানটি হল ‘নদীর না সই কচুয়া, মাছ ধরে মাচুয়া’
এই গানটির সুরে অনুপ্রাণিত হয়ে কবি কয়েক মিনিটের মধ্যেই যে গানটি রচনা করেছিলেন সেটি হলে ‘নদীর নাম সই অঞ্জনা, নাচে তীরে খঞ্জনা’
কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন পশ্চিম বাংলার মানুষ, কিন্তু তিনি ছিলেন ভবঘুরে ও বাউন্ডুলে। তাই পশ্চিম বাংলার মানুষ হয়েও কিশোর বয়সে তিনি পূর্ববাংলার অপূর্ব শ্যামল স্নিগ্ধ পল্লী প্রকৃতির সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং রচনা করেছিলেন অসংখ্য ভাটিয়ারী গান। চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী ভিত্তিক ‘সম্পান গান’ শুনে নজরুল কতটা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তা শাসসুন নাহারের লেখা থেকে বোঝা যায়।
‘১৯২৬ থেকে ১৯২৯ এই বছর তিনেকের মধ্যে নজরুলকে দুবার আমরা চট্টগ্রামে পেয়েছিলাম আমাদের বাড়িতে। ... নজরুল নদী ভ্রমণে ও সমুদ্র বিহারে ফরমায়েশ করে মাঝিদের কণ্ঠে সম্পানদের গান শুনে অজস্র। আবার অন্যদিকে বাড়ি ফিরে রচনা করে চলতেন নিজেও। আমার সম্পান যাত্রী না লয়, ভাঙা আমার তরী, আমার গহীন জলের নদী। নিজেই সুর দিয়ে যখন গাইতেন তখন শ্রোতাদের উৎসাহের সীমা থাকত না।’
এইভাবেই কাজী নজরুল ইসলাম বিভিন্ন ধরনের লোক সংগীতকে তাঁর অসামান্য দক্ষতায় আত্মস্থ করেছেন এবং নিজে অত্যন্ত সাবলিল ভাবে সৃষ্টি করেছেন বাংলার লোক সংগীতের বিভিন্ন ধারার গানগুলিকে। কবি নজরুল যে ঐক্য বা মিলনে বিশ্বাস করতেন, তা তাঁর রচিত বিভিন্ন আঙ্গিকের লোকগানগুলি শুনলেই বোঝা যায়।
সাহিত্য-সংস্কৃতি সব খবর















