বাবাকে শেষবিদায়ে ছুটে গেলেন মেসি, মাঠে দে পলের আবেগী শ্রদ্ধা
ক্রীড়া ডেস্ক, সিভয়েস২৪
বাবা ছিলেন তার ফুটবল স্বপ্নের প্রথম সারির মানুষ। মেসির সেই ছায়াসঙ্গী হোর্হে মেসি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বাবার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে সবকিছু ফেলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ছুটে গেলেন লিওনেল মেসি। আর মেসির এই কঠিন সময়ে মাঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে মনে করলেন সতীর্থ রদ্রিগো দে পল।
শোকের ভার যেন তখন পুরো পরিবারকে ঘিরে। বাবাকে হারানোর খবর পাওয়ার পর আর যুক্তরাষ্ট্রে থাকার মতো মানসিক অবস্থায় ছিলেন না লিওনেল মেসি। ইন্টার মায়ামির কাছ থেকে ছুটি নিয়ে স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও সন্তানদের সঙ্গে প্রাইভেট বিমানে আর্জেন্টিনার উদ্দেশে রওনা দেন তিনি।
গন্তব্য সেই চেনা শহর—রোজারিও। যে শহরের অলিগলি থেকে শুরু হয়েছিল তার স্বপ্নের ফুটবলযাত্রা, সেখানেই এবার ফিরলেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে। তবে এবার কোনো ম্যাচ খেলতে নয়, বাবাকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে।
স্থানীয় সময় রাত ৮টার কিছু পর রোজারিওতে পৌঁছান মেসি। পাশে ছিলেন স্ত্রী ও সন্তানরা। পরিবারের অন্য সদস্যদের পাশাপাশি মা সেলিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
৬৮ বছর বয়সী হোর্হে মেসি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। তবে তার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। স্থানীয় সময় শুক্রবার দিবাগত রাত ২টার দিকে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। রোজারিওর কাছের শহর পেরেজে তাঁকে সমাহিত করার কথা রয়েছে।
লিওনেল মেসির জীবনে হোর্হে মেসির ভূমিকা ছিল অনন্য। ছেলের শৈশবের ফুটবল থেকে শুরু করে পেশাদার ক্যারিয়ারের উত্থান—প্রায় প্রতিটি বাঁকেই ছিলেন তিনি।
বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়ে ওঠার দীর্ঘ যাত্রায় মেসির পাশে ছায়ার মতো ছিলেন বাবা। সেই মানুষটিকেই এবার চিরতরে বিদায় জানাতে রোজারিও ফিরেছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
মেসির বাবার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ফুটবলবিশ্ব থেকেও নেমে আসে শোকের ছায়া। তাঁর সাবেক ক্লাব বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, রোজারিও সেন্ট্রাল, নিউয়েলস ওল্ড বয়েজসহ বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠন মেসি ও তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে।
বাবার মৃত্যুর কারণে লিগস কাপের ম্যাচে মন্টেরির বিপক্ষে খেলতে পারেননি মেসি। তার অনুপস্থিতিতেই মাঠে নামে ইন্টার মায়ামি।
ম্যাচ শুরুর আগে মেসি ও তাঁর পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। গ্যালারিতেও দেখা যায় আবেগঘন দৃশ্য। সমর্থকদের হাতে ছিল—‘ফোর্সা, লিও’, অর্থাৎ ‘শক্ত থাকো, লিও’ লেখা প্ল্যাকার্ড।
তবে সবচেয়ে আবেগী মুহূর্তটি আসে ম্যাচের ৩২ মিনিটে। ডি-বক্সের অনেক বাইরে থেকে বল পেয়ে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে নিচু ও জোরালো শটে গোল করেন রদ্রিগো দে পল। গোল হওয়ার পরই দৌড়ে সাইডলাইনের দিকে যান তিনি। এরপর খুলে ফেলেন নিজের জার্সি। আর তখনই প্রকাশ পায় ভেতরের গল্পটি।
দে পলের গায়ে ছিল লিওনেল মেসির ১০ নম্বর জার্সি। মেসির নাম লেখা সেই জার্সি দেখিয়ে গোল উদযাপন করেন আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার। কোনো দীর্ঘ বক্তব্য নয়, কোনো আলাদা আয়োজন নয়—ফুটবলের মাঠেই বন্ধুর পরিবারের প্রতি ভালোবাসা ও সমবেদনা জানালেন তিনি।
জার্সি খুলে গোল উদযাপন করায় অবশ্য হলুদ কার্ড দেখতে হয় দে পলকে। কিন্তু সেই কার্ডের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মুহূর্তটির আবেগ।
মেসির সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও জাতীয় দলের সম্পর্ক রয়েছে দে পলের। মাঠে-বাইরে দুজনের বন্ধনও বেশ গভীর। তাই মেসির বাবার মৃত্যুর শোক যে তাঁকেও ছুঁয়ে গেছে, সেটিই যেন প্রকাশ পেল ওই উদযাপনে। দে পলের গোলটি যেন শুধু একটি গোল ছিল না—ছিল শোকাহত বন্ধুর পাশে দাঁড়ানোর এক নীরব বার্তা। ‘লিও, তুমি একা নও।’
ম্যাচটি অবশ্য শেষ পর্যন্ত মেসির দল ইন্টার মায়ামির পক্ষে যায়নি। দে পলের গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ায় মন্টেরি। ৪৭ মিনিটে হুগো কিউপ্রাস এবং যোগ করা সময়ে ডিয়েগো রসি গোল করলে ২-১ ব্যবধানে জয় পায় মন্টেরি।
ম্যাচের ফল হয়তো মেসির জন্য খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তার কাছে তখন সবচেয়ে বড় ছিল পরিবার—আর সেই পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে চিরতরে বিদায় জানানোর কঠিন সময়।
ফুটবল তাকে দিয়েছে বিশ্বজোড়া খ্যাতি, অসংখ্য ট্রফি আর কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা। কিন্তু বাবাকে হারানোর এই দিনে মেসি আবারও ফিরে গেলেন সেই ছোট্ট রোজারিওতে—যেখান থেকে তার স্বপ্নের শুরু, আর যেখানে এবার শেষ হলো তাঁর বাবার পথচলা।
খেলাধুলা সব খবর















