Cvoice24.com

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে আরএনবিতে গণবদলি, পেছনে পয়সার ঝনঝনানি

সিভয়েস২৪ প্রতিবেদক
০০:০২, ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে আরএনবিতে গণবদলি, পেছনে পয়সার ঝনঝনানি

রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) পূর্বাঞ্চলে একদিনেই ৩০ জন সদস্যকে বদলি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) চারটি পৃথক দপ্তরাদেশে এই বদলির নির্দেশনা দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রশাসনিক স্বার্থে দেওয়া হলেও এসব বদলির আড়ালে চলছে দীর্ঘদিনের ‘বদলি–বাণিজ্য’।

চিফ কমান্ড্যান্ট (পূর্ব) এর অধীনে সিআরবিস্থ সদর রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ড্যান্ট মোহাম্মদ ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত দুটি আদেশে ৭ জন করে মোট ১৪ জন সিপাহিকে বদলি করা হয়। আদেশে বলা হয়, বদলি ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে কার্যকর করতে হবে। অন্যথায় ১৭ ডিসেম্বর থেকে সংশ্লিষ্ট সদস্যকে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত হিসেবে গণ্য করা হবে।

এদিকে একই দিন চট্টগ্রাম বিভাগের কমান্ড্যান্ট মো. শহীদ উল্লাহর স্বাক্ষরে জারি হওয়া আরও দুটি দপ্তরাদেশে ৮ জন করে মোট ১৬ জন সিপাহিকে বদলি করা হয়েছে। এই আদেশ ১৩ ডিসেম্বরের মধ্যে কার্যকর না হলে ১৪ ডিসেম্বর থেকে তাদের অবমুক্ত ধরা হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।

দপ্তরাদেশে আরও বলা হয়, এই বদলি প্রশাসনিক স্বার্থে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের সম্মতিক্রমে জারি করা হয়েছে।

এর মাত্র তিন দিন আগে, ৮ ডিসেম্বর, আরএনবির পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের দুই শীর্ষ পদে রদবদল করা হয়। পূর্বাঞ্চলের চিফ কমান্ড্যান্ট মো. আশাবুল ইসলামকে পশ্চিমাঞ্চলে এবং পশ্চিমাঞ্চলের চিফ কমান্ড্যান্ট জহিরুল ইসলামকে পূর্বাঞ্চলে বদলি করা হয়। তবে কর্মকর্তারা এখনও বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করেননি।

দপ্তরাদেশে প্রশাসনিক স্বার্থে বদলির কথা বলা হলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক আরএনবি সদস্য বলেন, চিফ কমান্ডেন্ট বদলি হওয়ায় তিনি যাবার বেলায় এই গণবদলির আয়োজন করেছেন। প্রতিটি বদলি হয়েছে যার যার পছন্দের জায়গায়। যে যেখানে যেতে চেয়েছেন তাকে সেখানে বদলি করা হয়েছে। বদলি হতে জনপ্রতি ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে একজন আরএনবি সদস্য বলেন, চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে দুই মাস আগে সিপাহি মো. সাদ্দাম হোসেনকে বদলি করে সিআরবিতে আনা হয়। কিন্তু সাদ্দামের পছন্দের জায়গা চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন। তাই এবার সুযোগে তিনি অর্থের বিনিময়ে তার পছন্দের কর্মস্থলে বদলি নিয়েছেন। এরকম আরও অনেকেই আছেন বলে জানান তিনি।

একাধিক আরএনবি সদস্য জানান, আরএনবিতে বদলি-বাণিজ্য ওপেন সিক্রেট বিষয়। ইনস্পেক্টর পদে বদলিতে এক লাখ ৫০ হাজার, হাবিলদার পদে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ এবং সিপাহি পদে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। তারা জানান, বদলির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ লেনদেনই পরোক্ষভাবে নিয়মে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। বদলি ঠেকাতে বা পছন্দের জায়গায় যেতে দুই ক্ষেত্রেই টাকা দিতে হয় শীর্ষ কর্তাদের।

এই বদলি বাণিজ্যের টাকার সবচেয়ে বড় অংশ যায় চিফ কমান্ডেন্ট মো. আশাবুল ইসলামের পকেটে, তার পরের ভাগ পান চট্টগ্রাম বিভাগের কমান্ড্যান্ট মো. শহীদ উল্লাহ। সদর রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী সিআরবির কমান্ড্যান্ট মোহাম্মদ ওমর ফারুক একটি অংশ পান বলে জানা গেছে।

চিফ কমান্ডেন্ট মো. আশাবুল ইসলামের বিরুদ্ধে আরএনবিতে বদলি বাণিজ্য, র‌্যাঙ্ক বাণিজ্যের অভিযোগ নতুন কিছু নয় বলে জানান একাধিক আরএনবি সদস্য। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে প্রশাসনিক সিনিয়রিটি উপেক্ষা করে কম অভিজ্ঞ বা সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং দেওয়া, বিতর্কিতদের ইউনিট প্রধানের দায়িত্ব দেয়া, অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়া, নির্ধারিত মাসোহারা না দিলে সংশ্লিষ্ট স্টেশন ও ইউনিট থেকে বদলির চাপ দেওয়ার অভিযোগ আছে।

নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে চিফ কমান্ডেন্ট মো. আশাবুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা দায়ের করেছিল বলেও জানা গেছে।

গণবদলি ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে চিফ কমান্ডেন্ট মো. আশাবুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবগুলো বদলি আদেশ বাতিল করা হয়েছে। কমান্ডেন্ট চট্টগ্রাম বদলি করেছে আমি জানতাম না। হঠাৎ করে অনুমোদন চাইলো আমি দিয়ে দিলাম। পরে ভেবে দেখলাম যাওয়ার সময় এরকম বদলি করা ঠিক না, আমি যেহেতু চলে যাবো। তাই বলেছি এটা বাতিল করে দাও। প্রশাসনিক স্বার্থে করছিল তবে আমি চাচ্ছি না যাওয়ার সময় এরকম বদলি হোক তাই বাতিল করে দিয়েছি।

বদলি বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো সঠিক না। বিষয়টি এরকম না। প্রশাসনিক স্বার্থে এটা করা হয়েছে। এটা নিয়মিত বদলি। বদলি প্রশাসনিক স্বার্থেই। অনেকদিন একই কর্মস্থলে আবার অনেকের নামে কমপ্লেইন আছে তাই বদলি। তবে সিপাহি মো. সাদ্দাম হোসেনের উদাহরণ টেনে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন এমনটা হওয়ার কথা না। 

আমি ব্যস্ত ছিলাম সারাদিন। তার মধ্যে কমান্ডেন্ট বদলির অনুমোদন চেয়েছেন আমি কোনো কিছু না দেখেই অনুমোদন দিয়ে দিয়েছি। এটা আমার একটা ভুল ছিল। পরে মনে হলো এটা ঠিক না।

এদিকে চিফ কমান্ডেন্ট মো. আশাবুল ইসলাম বদলি আদেশ বাতিলের কথা বললেও কোনো অফিস আদেশ পাওয়া যায়নি। একাধিক সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে মৌখিকভাবে বদলি আদেশ স্থগিত করা হয়েছে।