কাপ্তাইয়ে সংরক্ষিত বনে মন্দিরের বহুতল ভবন নির্মাণ নিয়ে মতবিরোধ
কাপ্তাই (রাঙামাটি) প্রতিনিধি, সিভয়েস২৪
রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সীতা পাহাড় এলাকায় মন্দিরের নামে বহুতল ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে বন বিভাগ ও মন্দির কর্তৃপক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। বন বিভাগের দাবি, সংরক্ষিত বন ও হাতির আবাসস্থলে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ বন আইনের পরিপন্থী। তবে মন্দির কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী তীর্থস্থান হওয়ায় নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। এদিকে, ঘটনাটিকে একটি স্বার্থান্বেষী মহল ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে অপপ্রচারের চেষ্টা চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে বন বিভাগ।
কাপ্তাই বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণ বন বিভাগের অধীন কাপ্তাই বন রেঞ্জের রামপাহাড় বন বিটের সীতা পাহাড় ব্লকের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সম্প্রতি সীতা মন্দিরে তিনতলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। খবর পেয়ে কাপ্তাই বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সীতা পাহাড়ে বর্তমানে যে মন্দিরটি রয়েছে, সেটি মূলত বহু বছর আগে ধ্যানের জন্য একটি ছোট কক্ষ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। তৎকালীন রাঙামাটি দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) অসিত রঞ্জন পালের দায়িত্বকালে এটি নির্মাণ করা হয় বলে জানা গেছে। এলাকাটি লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন এবং বন্য হাতির অন্যতম আবাসস্থল হওয়ায় সেখানে নতুন স্থাপনা নির্মাণ পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর জন্য হুমকি সৃষ্টি করবে বলে মনে করছে বন বিভাগ।
কাপ্তাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. জামাল হোসেন তালুকদার বলেন, ‘রামপাহাড় বিটের সীতা ঘাট এলাকায় বহু বছর আগে ছোট একটি ধ্যানঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু সংরক্ষিত বন ও হাতির আবাসস্থলে নতুন স্থাপনা নির্মাণ কোনোভাবেই অনুমোদনযোগ্য নয়। বন আইন অনুযায়ী অবৈধ নির্মাণকাজ বন্ধ করায় একটি সুবিধাভোগী চক্র বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে নিয়ে বন বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।’
কাপ্তাই বন রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মামুনুর রহমান বলেন, মন্দিরটিকে সম্প্রসারণ করে জাঁকজমকপূর্ণভাবে গড়ে তুলতে রাঙামাটি জেলা পরিষদ সীতা পাহাড় মন্দির প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ দেয়। ২০২২ সালে তৎকালীন রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার ওই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন।
তার দাবি, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এ ধরনের নির্মাণ বন আইন, ১৯২৭-এর ২৬ ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। পাশাপাশি জাতীয় বননীতি-২০২৫ অনুযায়ী প্রাকৃতিক বনভূমি বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের আইন সাধারণ নাগরিকের পাশাপাশি সরকারি দপ্তর ও সংস্থার জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। অথচ সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে রাষ্ট্রের ক্ষতি করেছে।
মন্দির নির্মাণের শুরুতেই কেন বন বিভাগ ব্যবস্থা নেয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে মামুনুর রহমান বলেন, অতীতে ভুল হয়ে থাকলেও সেটি নতুন করে আইন লঙ্ঘনের বৈধতা দিতে পারে না। তিনি বলেন, সংরক্ষিত বনে প্রবেশ করে স্থাপনা নির্মাণ যেমন আইনবিরোধী, তেমনি সেই স্থাপনা সম্প্রসারণে সরকারি অর্থ বরাদ্দ ও প্রকল্প উদ্বোধন করাও আইনের পরিপন্থী।
বন বিভাগের একটি সূত্র জানায়, জনবল সংকটের কারণে অনেক সময় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ছোটখাটো অবৈধ স্থাপনা তাদের নজরের বাইরে থেকে যায়। তবে কোনো অবৈধ নির্মাণের তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সম্প্রতি একটি পক্ষ রাজনৈতিক প্রভাব ও গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে বলেও দাবি করেছে বন বিভাগ।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা আরও জানান, সংরক্ষিত বনভূমিতে মসজিদ, মন্দির, গির্জাসহ কোনো ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি নেই। এর আগে ২০২৫ সালে কাপ্তাই রেঞ্জের শুকনোছড়ি বিট এলাকায় একটি মাদ্রাসা ও একটি মসজিদের নির্মাণকাজ বন্ধ করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সীতা মন্দিরের অধ্যক্ষ জ্যোর্তিময়ানন্দ মহারাজ বলেন, ‘আমাদের ভবন নির্মাণকাজের প্রায় ৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে। বর্তমানে বাকি কাজ বন্ধ রয়েছে। আমরা চাই মন্দিরের কাজ আবার চলমান থাকুক।’
মন্দিরের জন্য সরকার বা বন বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, এ ধরনের কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তবে এটি সীতা পাহাড়ের অংশ হওয়ায় সীতা দেবীর পৌরাণিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বহু বছর ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এখানে তীর্থস্থান হিসেবে পূজা-অর্চনা করে আসছেন।’
এদিকে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাঙামাটি জেলা পরিষদের সদস্য ও কাপ্তাইয়ের হেডম্যান ক্যাচিং মারমার সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
পাহাড় সব খবর















